৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
গাঁজার চক্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর !
গাঁজার চক্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর !

তহীদ মনি : ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যশোরের একটি আভিযানিক হাজির হয় যশোর সদর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম খিতিবদিয়ায়। ওই গ্রামের বাসিন্দা মিন্টু বিশ্বাসের বসত বাড়ির উঠোন থেকে উদ্ধার করে একটি গাঁজা গাছ। আটক হয় মিন্টু বিশ্বাস। মামলাও হয় তার নামে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যখন গাঁজার চক্রে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরছে, তখন শহরের অলি গলি পাড়া মহল্লায় চলছে মাদকের রমরমা কারবার। হরেক নামে, নানা কৌশলে চলছে বিকিকিনি। রাস্তাঘাটে দলবদ্ধ তরুন, যুবক দেখলেই সাধারণ মানুষের ভাবনায় আসছে তারা মাদকসেবী। সচেতন অভিভাবকরা বলছেন, নিজের সন্তান যে মাদকের ছোয়া পায়নি এমন নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না বরং প্রশাসনের উচিৎ কলেজ ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের ডোপটেস্ট করানো। গেল ডিসেম্বরে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়েও ডোপটেস্টের প্রস্তাব দেন কয়েক সদস্য।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যশোরের ২০২২ সালের পরিসংখ্যান বলছে, এ বছরে অভিযান চলেছে ২ হাজার ২৬৭টি। এ সব অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৪৮টি গাঁজা গাছ, ৬৬ কেজি ৬২ গ্রাম গাঁজা, ১০ হাজার ১৯৬ পিস ইয়াবা, ৪২৪ বোতল ফেনসিডিল, ২ হাজার ৯২৪ পিস ট্যাপেন্টডল ট্যাবলেট, ৬ হাজার লাল বর্ণের ট্যাবলেট, ১৫ লিটার চোলাইমদ, ৪০ লিটার তাড়ি, আরএস ২৮৮ বোতল, ভারতীয় মদ ১২০০ গ্রাম ও ৮ গ্রাম হেরোইন। উদ্ধার করা হয় ৪ লাখ ৯২ হাজর টাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছেন, তাদের জনবল খুবই কম। জেলায় তাদের লোকবল মাত্র ৩০ জন, নেই কোনো অস্ত্রও। তাই ইচ্ছে করলেও তারা অনেক কিছু করতে পারেন না।

মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশেষভাবে নিয়োজিত এ সংস্থার তৎপরতা যাই থাক মাদকসেবক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে যশোরে। বিষয়টি নিয়ে শুধু সচেতন মানুষ নয় উদ্বিগ্ন প্রশাসনও। যশোর জেলা প্রশাসনের সভাকড়্গে মাসিক আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও বার বার মাদকের বি¯ত্মার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা কমিটির সর্বশেষ সভায় বক্তারা জানান, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিড়্গার্থীরা মাদকের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ডোপটেস্ট করার প্র¯ত্মাব করেন কেউ কেউ। কিন্তু দেশের প্রচলিত ব্যবস্থায় এটি গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তা নিয়ে সিদ্ধাšত্ম হয়নি। কিন্তু ওই সভায় সিদ্ধাšত্ম হয়েছিল শিড়্গা প্রতিষ্ঠানে মাদকের কুফল নিয়ে সভা সেমিনার করবে সংশিস্নষ্ট প্রতিষ্ঠান। সেখানে এমএম কলেজ, সিটি কলেজ, দাউদ পাবলিক কলেজসহ শহরের বেশ কয়েকটি কলেজের কথাও উঠে আসে।


এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রসিকিউটর রাসেল আহমেদ বলেন, গ্রামাঞ্চলে কোনো বাড়িতে সে যত গোপনেই গাঁজা গাছ লাগাক না কেনো, কেউ না কেউ তা জানতে পারে। মোড়ের দোকানদার বা মাদক সেবীদের কথায় কথায় কেউ না কেউ জেনে ফেলে এবং তাদের দেওয়া গোপন খবরে উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়। শহরে এ জাতীয় খবর পাওয়া দূরম্নহ। এখানে ঘণ বসতি যেমন, জনসংখ্যার অধিক্যেও তেমন, ফলে অপরাধীরা সহজে স্থান পরিবর্তন করতে পারে। আবার ভয়েও অনেকে তথ্য দিতে চায় না। কেউ তথ্য না দিলে অধিদপ্তরের কিছু করার নেই।


এই যখন মাদক বি¯ত্মারের অবস্থা তখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। দূরের কোন গ্রামে কারো বাড়ির অঙ্গিনায় গাঁজার গাছ থাকার তথ্য যে সংস্থা জানতে পারে, তারা শহরের অলিগলিতে বিক্রি হতে থাকা মাদকদ্রব্য বিক্রির তথ্য কেন পায় না তা নিয়েই তাদের প্রশ্ন। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অদিদপ্তর শহরে মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরম্নত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা রেখেছে তেমন নজিরও চোখে পড়েনি বলে সুধি মহলের অভিযোগ। এ ড়্গেেত্র তারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নীতি-নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।


জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ ও প্রচারণা কমিটির সদস্য মসিউল আযম বলেন, মাদকের বি¯ত্মার কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। প্রতিটি মিটিংয়ে এর বিরম্নদ্ধে কথা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে না। তারা তৎপর হলে চিত্র এতটা ভয়াবহ হতো না।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুপ্রক) সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান জানান, জাতি শেষ হওয়ার পথে, এখান থেকে বের হতে হলে প্রথমেই মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে, বেশি করে দৃষ্টি দিতে হবে, প্রয়োজনে অদড়্গ পদধারীদের দায়িত্ব থেকে সরাতে হবে। কাজ সম্পন্নের জন্যে বেশি চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যশোর মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাজ সšেত্মাষজনক নয়। কখনো কাজ করে কখনো উল্টো চিত্র ধরা পড়ে। তবে কাজ যথাযথ হলে এতটা বি¯ত্মার হতো না।


সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, যার যা কাজ তা তো হচ্ছে না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাজ হলো মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করা কিন্তু সেই কাজটিই তারা করছে না। তার মতে, এ জাতীয় একটি দপ্তর থাকা সত্ত্বেও যেহেতু নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না তা হলে ধরেই নিতে হবে প্রত্যড়্গ বা পরোড়্গভাবে যারা এই দায়িত্বে রয়েছে তারা এর সাথে জড়িত অথবা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। তিনি এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যে মাদকের উৎস এবং মাদক ব্যবসা বন্ধ করার আহবান জানান।


এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়ূন কবীর জানান, শুধু মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিস বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদক নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। পরিবার কেন্দ্রিক মাদক বিরোধী অবস্থান ও নজরদারি দরকার। তিনি জানান, অতীতেও মাদকের বিস্তার ছিল এখনো রয়েছে। জেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এই মাদক ব্যবসার জন্যে উৎকৃষ্ট স্থান। যশোর কিন্তু মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল নয়। ইয়াবা, ফেনসিডিল, ট্যাপেন্ডাল, হেরোইন এর কোনোটাই স্থানীয় পণ্য নয়। এর সাথে জড়িতরা অনেক বেশি জাল বিস্তার করে আছে।

শিড়্গার্থীদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, সমাজে অসঙ্গতি থাকলে মাদকের ভয়াবহতা বাড়ে। মাদ্রক থেকে যেমন নানা সমস্যার সৃষ্টি হয় তেমনি সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতি, বেকারত্ব, হতাশা, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, কর্ম ও অর্থহীনতা বা অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ, দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা, পারিবারিক শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ অনেক কারণে মাদকের চাহিদা বাড়ছে যোগান সহজ থাকায় সহজলভ্যও হচ্ছে। মাদক একেবারে বন্ধ করা গেলে হয়তো সমস্যার সমাধান হবে তবে সে ড়্গেেত্র বিদেশ থেকে মাদক আসাটা আটকানোর সম্পূর্ণ উপায় কি? নগদ টাকা বা অন্য কোনো প্রলোভনে কেউ না কেউ অবৈধভাবে এর পাচারের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে।


তিনি বলেন, প্রতিমাসে গড়ে সাড়ে ৩ থেকে ৪শজনকে আটক করা হচ্ছে, একটি জেলার জন্যে সেটা অনেক অগ্রগতি। মাদক সিন্ডিকেটের পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙ্গা শুধু তাদের পড়্গে সম্ভব নয়। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এর থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : শাহীন চাকলাদার  |  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আমিনুর রহমান মামুন।
১৩৬, গোহাটা রোড, লোহাপট্টি, যশোর।
ফোন : বার্তা বিভাগ : ০২৪৭৭৭৬৬৪২৭, ০১৭১২-৬১১৭০৭, বিজ্ঞাপন : ০১৭৩০৮৫৫৯৭৯, ০১৭১১-১৮৬৫৪৩
Email : samajerkatha@gmail.com
স্বত্ব © samajerkatha :- ২০২০-২০২২
crossmenu linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram