উদীচী যশোরের শরৎ উৎসব
সঙ্গীত নৃত্য আর আবৃত্তিতে শারদীয় আরাধনা 

72
উদীচী যশোরের শরৎ উৎসবসঙ্গীত নৃত্য আর আবৃত্তিতে শারদীয় আরাধনা 

নিজস্ব প্রতিবেদক :
নীলাকাশে সাদা মেঘেদের ভেসে যাওয়া, নদীপাড়ে কাশফুলের দোল; রাতে সুগন্ধ ছড়ানো শিউলি ফুলগুলো ভোরে শ্রান্ত হয়ে শিশির ভেজা ঘাসের বিছানায় তারার মত ছড়িয়ে থাকা জানান দিচ্ছে বঙ্গদেশে হাজির হয়েছে ঋতুরাণী ‘শরৎ’।
‘আজিকে তোমার মধুর মুরতী হেরিনু শরৎ প্রভাতে, হে মাতা বঙ্গ- শ্যামল অঙ্গ ঝরিছে অনল শোভাতে…’ কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এমন শরৎ বন্দনায় বাঙালি অন্তঃপ্রাণ মেতে ওঠে প্রকৃতির সাজে। সংস্কৃতিপ্রেমীরা ঋতু বৈচিত্র্যের বাংলায় নদীর পাড়ের শ্বেতশুভ্র কাশের সমুদ্দুর আর আকাশ জুড়ে নীলের মেলায় প্রকৃতির অপরূপ রূপে মুগ্ধ হয়ে মেতে ওঠে প্রকৃতি বন্দনায়। তারই রেশ ধরে নগর জীবনের বাস্তবতায় শরতের নান্দনিক রূপ ভুলতে বসা নাগরিকদের আবহমান বাংলার শরতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে যশোরে আবারো অনুষ্ঠিত হল ‘শরৎ বন্দনা’।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যশোর জেলা শাখার আয়োজনে সঙ্গীত, নৃত্য আর আবৃত্তিতে শিল্পীরা বেনুর সুরে শারদ শৈলীতে অরুণ আলোর অঞ্জলি দিলেন কাশ-ফুল, নীল আকাশে সাদা মেঘ, রংধনু আর স্নিগ্ধতার ঋতু- শরৎকে। ৮ আশ্বিন শুক্রবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনের নান্দনিক মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় দেড় শতাধিক শিল্পীদের পরিবেশনায় শরৎ উৎসব।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শ্বেতশুভ্র পোষাক পরিহিত সংগঠনের নৃত্যশিল্পী সম্পা, স্বপ্না ও জাহিদ পরিবেশন করেন কত্থক, ভরত নাট্যম ও ওড়িশি নৃত্যের সমন্বয়ে ‘পুষ্পাঞ্জলি’। এরপর শরৎ বন্দনায় সমৃদ্ধি গেয়ে শোনায় ‘বাজলো তোমার আলোর বেনু…’ এবং সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্র সংগীত ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি…’।
উদ্বোধনী এ পরিবেশনার পর হয় উদীচীর আবৃত্তি বিভাগের শিশুদের ‘সোনার শরৎ’ শীর্ষক বৃন্দ আবৃত্তি। সৃজিতা গেয়ে শোনায় রবীন্দ্র সংগীত ‘তোমরা যা বলো তাই বলো; আমার লাগে না মনে…’, আলিফ গেয়ে শোনায় আধুনিক গান- ‘আকাশের হাতে আছে এক রাশ নীল…’, মিতা গেয়ে শোনান রবীন্দ্র সংগীত ‘আলোর অমল কমলখানি…’ সামছুন্নাহার পরিবেশন করেন নজরুল সংগীত ‘ভুলি কেমনে আজো যে মনে বেদনা-সনে রহিল আঁকা…’, অমল ধবল পালে লেগেছে… রবীন্দ্র সংগীতটি গেয়ে শোনান কানিজ, ডিএল রায়ের ‘আমরা এমনি এসে ভেসে যাই… গানটি শোনান সুব্রত দাস, আধুনিক গান- স্বপ্নে দেখি একটি নতুন ঘর… শোনান দীপান্বিতা, ‘গাছের পাতায় রোদের ঝিকিমিক…’ পরিবেশন করেন এমলিনা, তুর্যয় শোনান ‘ও আকাশ সোনা সোনা…’ রাজন্যা পরিবেশন করেন ‘না বলে এসেছি তা বলে ভেবো না না বলে চলে যাব…’, ‘পাগলা হাওয়ার তরে মাটির পিদিম নিভু নিভু করে…’ গেয়ে শোনান শেখর দেবনাথ, ওয়াজীহা শোনান ‘এই মোম জোছনায়, গোবিন্দ দাস পরিবেশন করেন ‘চাঁদ কেন আসে না…’ ‘প্রিয়তমা’ শীর্ষক ‘এ নিশীথে অনায়াসে খেলা করে আলো-ছায়া…’ গানটি পরিবেশন করেন মুস্তাহীদ। এছাড়া সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্র সংগীত ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা’, ও ‘কে রয় ভুলে তোমার…’। সংগীত নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশনার পর সবশেষে সমবেত গান ও নৃত্যে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্র সংগীত ‘আনন্দ ধারা বহিছে ভূবনে…’।
আয়োজন বিষয়ে উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব জানান, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য তার সংস্কৃতি। যার সাথে মিশে আছে ঋতু বৈচিত্র্য। অভিনব সব সাজে চিরায়ত বাংলা রূপ বদলায় ঋতুতে ঋতুতে। শরতে প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে একাত্মতা প্রকাশে সংস্কৃতিপ্রেমী যশোরবাসীকে আনন্দ দিতে এ উৎসবের ভাবনা।
তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ঋতু বৈচিত্র্যের নিবিড় পরিচয় ঘটানোর তাগিদ থেকেই এ উদ্যোগ। এ লক্ষ্য নিয়ে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পহেলা আশি^ন যশোরে প্রথমবারের মত শুরু হয় শরৎ উৎসব। তারই ধারাবাহিকতায় এবারের এ আয়োজন।