‘আইডিয়া ফ্রাইডে মিল’র ৫০তম সপ্তাহ পূর্তি
#পোলাও মাংসে তৃপ্তির আহার দুই সহস্রাধিক অসহায় ও হতদরিদ্রের

83
‘আইডিয়া ফ্রাইডে মিল’র ৫০তম সপ্তাহ পূর্তি #পোলাও মাংসে তৃপ্তির আহার দুই সহস্রাধিক অসহায় ও হতদরিদ্রের

জাহিদ হাসান :
চোখে-মুখে এক অন্যরকম খুশি নিয়ে চেয়ারে বসে আছেন বিভিন্ন বয়সের অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষেরা। এদের সামনে টেবিলে চীনামাটির সাদা প্লেটে সাজানো রয়েছে পোলাও, ডিম, ডাল, মাছ, রোস্ট ও দই। এইসব মানুষেরা কেউ থাকেন বস্তিতে, কেউবা রেলস্টেশনে। আবার কেউবা ঘোরেন পথে পথে। শুক্রবার দুপুরে অসহায় এমন অন্তত সাড়ে ৩শ’ নারী, পুরুষ ও শিশু এসেছিলেন যশোর শহরের খড়কি আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থায়। সুজ্জিত টেবিলে সুশৃঙ্খলভাবে বসে সবাই পেটপুরে আহার করলেন তৃপ্তিসহকারে। এভাবেই ব্যতিক্রমী আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে ‘আইডিয়া ফ্রাইডে মিল’র ৫০তম সপ্তাহ। ‘আইডিয়া ফ্রাইডে মিল’র ৫০তম সপ্তাহ উপলক্ষে শুধু যশোরে নয়; দেশের অন্তত ১১টি জেলায় এই ‘ফ্রাইডে মিল’এ দুই সহস্রাধিক হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে যশোর শহরের খড়কি এলাকায় অবস্থিত আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা’য় গিয়ে দেখা যায়, লাইন দিয়ে চেয়ার টেবিলে বসে অসহায়, দরিদ্র মানুষগুলো পোলাও মাংস খাচ্ছেন। আইডিয়ার স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের রান্না করা খাবার প্লেটে প্লেটে তুলে দিচ্ছেন। খাবার খেয়ে নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে যাচ্ছিলেন যশোর শহরের রেলগেট এলাকার বৃদ্ধা বুলবুলি বেগম (৬০)। নিজে পোলাও-মাংস খেয়ে স্বামীর জন্যও নিয়ে যাচ্ছিলেন আইডিয়ার প্যাকেটে। তিনি বললেন, ‘এই সংস্থা ডাকলি চাইরডে ভাল-মন্দ খাতি পারি। নিজে খাইয়ে স্বামীর জন্যি নিয়ে যাচ্চি।’ খড়কি রেললাইন এলাকার আমেনা বেগমের স্বামী-সন্তান কিছুই নেই। বললেন, ‘কবে পোলাউ-গোস্ত খাইচি, কতি পারিনে। এহেনে আইসে পেট ভইরে খাইচি। মনডায় অনেক শান্তি!’ নজরুল ইসলাম নামে এক রিকসা চালকও এসেছিলেন খাবার খেতে। তিনি বলেন, ‘কত দিন রোস্ট খাইনি। আজ ডিম-রোস্ট দিয়ে পেট ভরে ভাত খাইচি। প্রতি শুক্কুরবার দুপুরে এরা খাবার দেয়। শুধু কি খাবার; এদের অ্যাপায়নও খুব ভালো।’ আমেনা বেগম নামে এক বৃদ্ধা বলেন, ‘একদিনে একবেলা ভালো খাওয়ায় এখানে। কোনো টাকা লাগে না। তাই এখানে আসি। যে মানুষ এ কাজ করেছেন আল্লাহ তার ভালো করবেন। আমাগো মতো গরীব মানুষরে বিনা পয়সায় খাওয়াচ্ছেন।’
আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আইডিয়ার সাপ্তাহিক একটি প্রকল্প ‘আইডিয়া ফ্রাইডে মিল’। এখানে প্রতি শুক্রবার জুম’আ’র নামাযের পরে শিক্ষার্থীরা নিজেদের রান্না করা পোলাও-মাংস অসহায়, হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে পরিবেশন করেন। টানা ৫০ সপ্তাহ ধরে এটি চলে আসছে। এই প্রকল্প পরিচালনার একটি বিশেষ আর্থিক অংশ আসে শিক্ষার্থীদের পরিচালিত আইডিয়া’র আরেকটি সেক্টর আইডিয়া পিঠা পার্ক’র লভ্যাংশের ৩৫ভাগ থেকে। এছাড়াও অনেকে তাদের সন্তানের জন্মদিন কিম্বা প্রিয়জনের মৃত্যুবার্ষিকীর দোয়ার জন্যও এই প্রকল্পে যুক্ত হন। এই আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা যতদিন থাকবে; ততদিনই আমাদের এই ফ্রাইডে মিল কার্যক্রম চলমান থাকবে।
সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক জেসমিন আক্তার কামনা বলেন ‘আমরা যোগ হলে; সবারই খাবার মিলে’ মূলত এই স্লোগানে নিয়েই ফ্রাইডে মিলের যাত্রা হয়েছিলো। পথশিশু বা ভবঘুরে অসহায়রা ভালো খাবার পায় না। সপ্তাহে অন্তত একদিন ভালোমানের খাবার দিতে পারলে আমরা তৃপ্তি পাবো। আসলেই সেই তৃপ্তিটা নিয়েই আমাদের কার্যক্রম। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ফ্রাইডে মিল ৫০ সপ্তাহ পার করেছে। অভুক্তদের মাঝে খাবার দেওয়ার অনুভুতি আসলেই অন্যরকম। ফ্রাইডে মিল উপলক্ষে প্রতি শুক্রবারই আমাদের সকল আইডিয়ানদের কাছে ঈদের দিনের মতো। সবার মাঝে আনন্দ বিরাজ করে।
আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা’র প্রতিষ্ঠাতা, যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ’র সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. হামিদুল হক শাহীন বলেন, ‘ভালো কাজে সমৃদ্ধি আসে- তারই প্রমাণ আইডিয়া ফ্রাইডে মিল। ৫০ সপ্তাহ আগে মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বলেছিলাম সপ্তাহে পবিত্র জুম’আর এই একদিন কিছু মানুষের কাছে ভালো খাবার পৌঁছে তো আমরা দিতেই পারি। এভাবেই শুরু। এরপর সুহৃদ, বন্ধু, পরিজন এর সাথে যুক্ত হয়েছেন এবং এর বহর বেড়েই চলেছে। এবার ৫০তম সপ্তাহে তাই মহাসমারোহে পালিত হলো এই আয়োজন। আইডিয়া ফ্রাইডে মিল যেন না থামে সেটাই আমাদের ইচ্ছা।’
বাংলাদেশ শিক্ষার্থী ও উদ্যোক্তা গ্রুপ (উইনি) আইডিয়ার ভার্চুয়াল আরেকটি প¬াটফর্ম। এর নির্বাহী প্রধান মল্লিকা আফরোজ জানান, ‘আইডিয়া ফ্রাইডে মিল’র ৫০তম সপ্তাহ উপলক্ষে উইনি প্লাটফর্মও এগিয়ে এসেছে। যশোর ছাড়াও আরও বিভিন্ন জেলায় এই ফ্রাইডে মিল কর্মসূচি পালিত হয়েছে। উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে ঢাকা, খুলনা, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, সিলেট ও খাগড়াছড়িসহ আরও কয়েকটি স্থানে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
আইডিয়ার স্বেচ্ছাসেবক সোহরাব হোসেন বলেন, ফ্রাইডে মিল আয়োজনের অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। নিজেরা বাজার করে, রান্না করে যখন হঠাৎ কোনো অনাহারির সামনে খাবার দিই, খুশিতে অনেকে কেঁদে ওঠে। অনেকেই বলে, কবে পোলাও মাংস খেয়েছে মনে নেই, এর স্বাদও ভুলে গিয়েছি। প্রত্যেকের ছোট ছোট প্রচেষ্টা মিলিত হলে, অনেকের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব- এর প্রমাণ আইডিয়া ফ্রাইডে মিল।