শারদীয় দুর্গোৎসব
যশোরে এবছর পূজা হবে ৭২৩ মন্দির মণ্ডপে
ব্যস্ত সময় পার করছেন ভাস্করেরা

313
শারদীয় দুর্গোৎসব যশোরে এবছর পূজা হবে ৭২৩ মন্দির মণ্ডপে ব্যস্ত সময় পার করছেন ভাস্করেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাঙালি সনাতন ধর্মবিশ্বাসীদের সবচেয়ে বড় সার্বজনীন ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা। ভাদ্রের শেষে শরৎ শুভ্রতায় চারিদিকে শুধু সাজ সাজ রবে উৎসবের আমেজ। শরতের নীল-সাদা আকাশ, ভোরের আবছা কুয়াশা, শোভা পাচ্ছে কাঁশফুল আর বাতাসে শেফালী ফুলের ঘ্রাণ। প্রকৃতির এ শোভনীয় রূপের মোহনীয় মুহূর্তে জানান দিচ্ছে অশুভনাশিনী আনন্দময়ী দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্যে দিয়ে ঢাক-ঢোল আর কাঁসার বাদ্যে শুরু হবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। দেবীর আগমনকে ঘিরে তাই ব্যস্ত যশোরের ভাস্করেরা। প্রতিমা তৈরি দেখতে মন্দির ও মণ্ডপেও আসছে অনেকেই।

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে নানা ধর্মীয় মাঙ্গলিক আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের শুরু। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর মহাপঞ্চমী, ১ অক্টোবর সকালে ষষ্টাদি কল্পারম্ভে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস, ওই দিন বিকেলে পূজারম্ভ। ২ অক্টোবর সকালে মহাসপ্তমি, ৩ অক্টোবর সকালে মহা অষ্টমী; যশোর রামকৃষ্ণ আশ্রমে কুমারীপূজা সকাল ১১টায়। ৪ অক্টোবর সকালে মহানবমী পূজা কল্পারম্ভ এবং ৫ অক্টোবর সকালে মহাদশমী কল্পারম্ভ-পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন।
এবছর দেবীর আগমন গজে; যার অর্থ শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা এবং কৈলাসে ফিরে যাবেন নৌকায়; যার অর্থ চারিদিকে ভাল ফসল ও জল বৃদ্ধি।

এরই আলোকে এ বছর যশোর জেলার ৮ উপজেলায় গত বছরের চেয়ে ২৫টি বেড়ে ৭২৩টি মন্দির ও মণ্ডপে পূজার আয়োজন চলছে পুরোদমে। মন্দিরে ও মণ্ডপে প্রতীমা তৈরির কাজে ব্যস্ত ভাস্করেরা। আয়োজকরাও বর্ণিল আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এখন শুধু অপেক্ষা সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। চারিদিকে ধ্বণিত হবে ‘রূপং দেহি, যশ দেহি, জয়ং দেহি, দিশো দেহি।’

এদিকে, যথাযথ মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজার আয়োজনে প্রস্তুতিসভা করেছে জেলা প্রশাসন। ৭ সেপ্টেম্বর সকালে কালেক্টরেটের অমিত্রাক্ষর সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত শারদীয় দুর্গাপূজা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে প্রস্তুতিসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান।
সভায় জানানো হয়- এবছর যশোরে সদর উপজেলায় ১৫০টি, যার মধ্যে পৌরসভায় ৪৬টি, শার্শায় ২৯টি, ঝিকরগাছায় ৫৭টি, যার মধ্যে পৌরসভায় ৯টি, মণিরামপুরে ১০৫টি, যার মধ্যে পৌরসভায় ৯টি, কেশবপুরে ৯৬টি, চৌগাছায় ৪৯টি, যার মধ্যে পৌরসভায় ৬টি, বাঘারপাড়ায় ৯৭টি এবং অভয়নগরে ১৩০টি মন্দির- মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজা মণ্ডপগুলোতে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মনিটরিং টিম কাজ করবে। উৎসবমুখর পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে দুর্গাপূজা আয়োজনের লক্ষ্যে সব রকমের প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এই লক্ষ্যে প্রশাসন এবং আইনশৃংখলা বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।

জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ‘সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য রাজনীতি থাকে। এছাড়া ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বও ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত সৃষ্টি করা নয়; আমাদের উদ্দেশ্য সম্প্রীতি, শান্তি, শৃঙ্খলা রক্ষা করা। আমরা শংকিত বা আতঙ্কিত নই; তবে আমরা সতর্ক। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে; সতর্ক থাকার কোন বিকল্প নেই। কারণ ষড়যন্ত্র হয়; সামাজিক- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র অতীতেও হয়েছে; এখনও তা চলমান।’ তিনি বলেন, আমরা এই জেলায় সাম্প্রদায়িক কোন সহিংসতা ঘটতে দেইনি; এমন দুর্ঘটনা ঘটেওনি। তারপরেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি সকলকে গুজবে কান না দেয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সতর্ক ও সচেতনতার সাথে ব্যবহার করার আহ্বান জানান।

সভায় মতামত ব্যক্ত করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম, আনসার ভিডিপি যশোর জেলা কমান্ড্যান্ট সঞ্জয় সাহা, পৌর মেয়র হায়দার গনী খান পলাশ, ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, সম্পাদক তৌহিদুর রহমান, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ফারাজি আহমেদ সাঈদ বুলবুল, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোরের সভাপতি হারুন অর রশীদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সভাপতি সুকুমার দাস, জনকণ্ঠ যশোরের প্রতিনিধি সাজেদ রহমান বকুল, যুগান্তর যশোরের ব্যুরো প্রধান ইন্দ্রজিৎ রায়, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট যশোরের সহকারী প্রকল্প পরিচালক চৈতি মহলদার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন যশোরের উপপরিচালক বিল্লাল বিন কাশেম প্রমুখ।

এছাড়াও বক্তব্য রাখেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন, সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ, শার্শা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বৈদ্যনাথ দাস, ঝিকরগাছার সভাপতি দুলাল অধিকারী, সদর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রবিন কুমার পাল, চৌগাছার সভাপতি বলাই চন্দ্র পাল, বাঘারপাড়ার সভাপতি সন্তোষ অধিকারী, কেশবপুরের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক গৌতম রায়, অভয়নগরের সভাপতি বিষ্ণুপদ অধিকারী, মণিরামপুরের সভাপতি তুলসী দাস প্রমুখ।

যশোর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন জানান, উৎসবটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, পূজা উপলক্ষে মন্দির- মণ্ডপভিত্তিক কমিটি করা হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। গত বছরের চেয়ে এবছর পূজার সংখ্যাও বেশি। সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন তিনি।

এদিকে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন ভাস্করেরা। যশোর বেজপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দির সমিতি প্রাঙ্গণে ভাস্কর জয়দেব পাল বলেন, অনেক আগেই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। খড় আর কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা নির্মাণের প্রাথমিক কাজও সম্পন্ন হয়েছে। দো-মাটির পর এখন প্রতিমাতে দেয়া হবে রং তুলির আঁচড়।