যশোরে এক ছাদেই দুষ্প্রাপ্য ৩৫০ শ্বেতচন্দন

174
যশোরে এক ছাদেই দুষ্প্রাপ্য ৩৫০ শ্বেতচন্দন

প্রণব দাস :
দেশে দুষ্প্রাপ্য হলেও যশোরের বাগমারাপাড়ায় এক বাড়ির ছাদে শোভা পাচ্ছে ঔষধি গুণসম্পন্ন ৩৫০টি শ্বেতচন্দন গাছ। সেখানে আরও শোভা পাচ্ছে দেড় শতাধিক বট, পাকুড়, অ্যাডেনিয়াম, অশ্বত্থ, তেঁতুল, অর্জুন, সৌদি খেজুর, পলাশ, বাগানবিলাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।

সরেজমিনে দেখা যায়, ছাদে সবুজের সমারোহ। সেখানে ছোট বড় গামলা ও প্লেটে রাখা বিশেষ মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট গাছ। বাড়ির ছাদে এমন দৃষ্টিনন্দন সবুজের সমারোহে বনসাই বাগান করেছেন সাজ্জাদ হোসেন (৪১)। সাজ্জাদ হোসেনের বাড়ি যশোর শহরের বাগমারাপাড়ায় (বিসমিল্লাহ গ্যারেজ)। একান্নবর্তী পরিবারের তিনটি বাড়ির ছাদে পাঁচ শতাধিক বনসাই রয়েছে তার।

সাজ্জাদ হোসেন জানান, বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বনসাইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর না এগোনোয় পারিবারিক সিদ্ধান্তে ২০০৭ সালে তিনি মালয়েশিয়া চলে যান। সেখানে তিনি এক চীনা নাগরিকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নান্দনিকভাবে সাজানো ১৭টি বনসাই দেখতে পান। সেগুলোর মধ্যে ছিল চায়না বট, তেঁতুল ইত্যাদি। বনসাইগুলো তাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেগুলো দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশে ফিরে বনসাই বাগান করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

২০১০ সালে সাজ্জাদ হোসেন দেশে ফিরে আসেন। সাজ্জাদ বলেন, প্রথমে তিনি কিছু জমি লিজ নিয়ে স্ট্রবেরি ও সবজি চাষ শুরু করেন। কিন্তু ওই কাজে সফল হননি। ২০১৩ সালে জানুয়ারিতে বট, পাকুড় ও অশ্বত্থের চারা সংগ্রহ করে বনসাই বাগান তৈরির কাজ শুরু করেন।
এরপর তিনি যশোর সদর উপজেলার বন বিভাগের ঝুমঝুমপুর এলাকার নার্সারি থেকে ১০টি শ্বেতচন্দনের চারা সংগ্রহ করেন। সেই ১০টি চারা থেকে আজ সাড়ে ৩শ’ শ্বেতচন্দনের গাছ শোভা পাচ্ছে তার ছাদ বাগানে। যে চারা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন; এখনও করছেন। বর্তমানে তার বাগানে ৮ বছর বয়সী ৪০টি, ৭ বছর বয়সী ৬০টি, ৬ বছর বয়সী ৬৫টি এবং ৪ বছর বয়সী ৭০টি শ্বেতচন্দনের বনসাই রয়েছে। এছাড়া তিন থেকে দুই বছর বয়সী আরও শতাধিক চারা রয়েছে। আট বছরের একটি শ্বেতচন্দন বৃক্ষের দাম দুই লাখ টাকার বেশি বলে জানান তিনি । বনসাই তৈরিতে সাজ্জাদ হোসেন কারও কাছে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেননি। শুরুর দিকে নিয়মিত যাতায়াত করতেন যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিতে। ঘেঁটেছেন এ-সংক্রান্ত বই। এসব বই-পুস্তক ও ম্যাগাজিন থেকে বনসাই তৈরির প্রণালি, গাছের খাবার ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা নেন। সেঅনুযায়ী তিনি নিজেই মাটি তৈরি করেন।

এছাড়া বাড়ির বারান্দায় ল্যাব তৈরি করেছেন সাজ্জাদ। এই ল্যাবে মাটি তৈরি করেন তিনি। বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি মাটিতে প্রথমে একটি গাছ এনে তিনি পরীক্ষা করেন। গাছে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করেন না। রোগবালাই দেখা দিলে মেহগনির পাতা পচানো পানির সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে গাছে ছিটিয়ে দেন।
সাজ্জাদ হোসেন জানান, ‘গত সাত-আট বছর ধরে শ্বেতচন্দন গাছের বনসাই করে সফল হয়েছি। বর্তমানে নিজের বাড়ির জায়গায় বেশ কয়েকটি এ চন্দন গাছ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রোপণ করেছি; যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে জমির অভাবে এ কাজ সফল হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, শ্বেতচন্দন এখন বিলুপ্তপ্রায়। আমি চেয়েছি, ঔষধি গুণের খনি ভেষজ শ্বেতচন্দন বৃক্ষটি মানুষের হাতের নাগালেই থাকুক। তাই যদি অনুমতি পাই- সরকারি বিভিন্ন অফিস আদালতের অব্যবহৃত জায়গায় এ গাছ রোপণ করতে চাই। সেই রোপণ করা গাছসহ পরিচর্যার দায়িত্ব তিনিই নেবেন। এ গাছ থেকে সরকার আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবে বলেও তিনি জানান।
সাজ্জাদ বলেন, ‘গাছের বয়স ২০ হলেই প্রায় পরিণত এই গাছ ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি কাঠ দেবে। মাটির উপরের ভাগের কাঠের বর্তমান দাম প্রতিকেজি ১৫ হাজার টাকা । গাছের বয়স ২০ বছর পার হলে আরও বেশি দাম পাওয়া সম্ভব।
সাবেক ফরেস্ট রেঞ্জার বৃক্ষপ্রেমী বীরমুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন দোদুল বলেন, এই ছাদ বাগান দেখলে অনেকেই শ্বেতচন্দন গাছ রোপণের আগ্রহ জন্মাবে। সাজ্জাদ হোসেনের এ উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে তিনি জানান।

সামাজিক বন বিভাগ যশোর অঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক অমিতা মন্ডল জানান, ‘চন্দন কাঠের চাষ বেশ লাভজনক, উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হ’ল; আমাদের দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এর বেশ চাহিদা রয়েছে। সেই প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজও এর চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে । চন্দন কাঠের চাষে আপনাকে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে, তার বহুগুণ বেশি অর্থ আপনি উপার্জন করতে পারবেন। অর্থাৎ এটি বেশ লাভজনক। তবে এর জন্য আপনাকে কমপক্ষে ১৫-২০ বছর দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে। এতে ব্যয় হয় প্রায় এক লাখ টাকা এবং এতে মুনাফা হয় ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত। শ্বেত চন্দন গাছগুলিকে চিরসবুজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর থেকে উৎপাদিত তেল এবং কাঠ ঔষধ তৈরি করতেও ব্যবহৃত হয়। শ্বেতচন্দন কাঠের তেল সাবান, প্রসাধনী এবং আতর সুগন্ধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তিনি জানান, এই গাছ চাষে তেমনভাবে কোনও খরচও নেই। সেচও লাগে কম। সঠিক নিয়মে রোপণ করে প্রথম দুই বছর গাছের সঠিক পরিচর্যা ও যত্ন নিতে পারলেই আর কোনও অসুবিধা নেই।

উল্লেখ্য, শ্বেতচন্দন ভারতের বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণে কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে ভালো জন্মে। তবে উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও উড়িষ্যাতেও চন্দন দেখা যায়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়। ধারণা করা হয় চন্দন ভারতীয় গাছ এবং নারায়ণ, মহাভারত এমনকি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও (খ্রিস্টপূর্ব-২০০) চন্দনের উল্লেখ আছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন চন্দনের আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপে।

শ্বেত চন্দন বার্ষিক ৬০০ মিলি মিটার থেকে ১৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত অঞ্চলে ভালো জন্মালেও কম ঢালবিশিষ্ট পাহাড়ি এলাকাই চন্দনের জন্য উত্তম। আবহাওয়া ভূ-প্রকৃতি অনুকূলে না থাকায় বাংলাদেশে শ্বেতচন্দন গাছ দুষ্প্রাপ্য এবং বিলুপ্তপ্রায়। তবে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়। এরইমাঝে যশোরের সাজ্জাদ হোসেনের এমন উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে অনেকেই মনে করেন।

উল্লেখ্য, সব চন্দন কাঠই উপকারী, তবে শ্বেত চন্দন যেমন দামী; তেমনী মানব স্বাস্থের জন্যও উপকারি অসাধারণ একটি দুর্লভ ভেষজ। সাদা চন্দনের গাছ থেকে পাতন ব্যবস্থায় তেল নিষ্কাশন করে প্রসাধনী, ঔষধ ও দামী আতর শিল্পে ব্যবহার করা হয়। শ্বেতচন্দন আমাদের কাছে সুগন্ধি কাঠ হিসেবে পরিচিত হলেও চন্দন কাঠের নির্যাস সাবান, পাউডার, আতর, ক্রিম, দাঁত মাজার পেষ্ট তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। আধুনিক ভেষজ শাস্ত্রে শ্বেতচন্দন বহু রোগের জন্য ব্যবহার করা হয়। যেমন অতিরিক্ত রক্তচাঁপ, ব্রঙ্কাইটিস এছাড়া পেনিসিলিন আবিষ্কারের বহু আগেই ভেষজ চিকিৎসকরা গনোরিয়া রোগের জন্য শ্বেতচন্দন ব্যবহার করেছেন। তখন চন্দনের তেলের সংগে অন্য দু’একটি ভেষজ মিশিয়ে ঔষধ বানানো হত। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সর্বত্রই এটি গনোরিয়ার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হত। এছাড়া খাদ্য হজম, ডায়রিয়া, আমাশয়, ঘামাচি, বসন্ত, হিক্কা সহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে চন্দনের বিভিন্ন ব্যবহার হয়েছে বর্তমানেও হইতেছে। রুপচর্চায় শ্বেত চন্দন ব্যবহারে যাদুকরি উপকার পাওয়া যায়।