ক্ষণিকা রক্ষায় ফুঁসে উঠেছে যশোরবাসী 

124

নিজস্ব প্রতিবেদক :
যশোরের ঐতিহ্যবাহী ক্ষণিকা পিকনিক কর্নার রক্ষায় ফুঁসে উঠেছে যশোরবাসী। উন্নয়ন প্রকল্পের অজুহাতে এ পিকনিক কর্নারের জায়গায় ‘ওয়েট স্কেল’ বসানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর ২০২২) মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন সংগঠন।

তাদের দাবি ‘ওয়েট স্কেল’ বসানো হলে পিকনিক কর্নারটিতে থাকা বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীরা খাদ্য ও বাসস্থান হুমকিতে পড়বে। তারা যেকোন মূল্যেই ক্ষণিকা পিকনিক কর্নার রক্ষা করতে বদ্ধ পরিকর। প্রয়োজনে আইনি লড়াইয়ের সঙ্গে যশোরের সকল রাজনীতিক সামাজিক সংগঠন নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে গড়ে তোলার হুশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালে অবাঙালি প্রকৌশলী ফারুকির উদ্যোগে ৫৬ বিঘা জমির উপরে প্রতিষ্ঠিত হয় যশোরের রামনগরের ঐতিহ্য ক্ষণিকা পিকনিক কর্নার। যা যশোরবাসীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানে বিশাল দিঘি ছাড়াও রয়েছে নানা ধরনের গাছ-গাছালি ও জীববৈচিত্র। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই জৌলুস হারাতে থাকে ক্ষণিকা। দীর্ঘ সংস্কার ও রক্ষনাবেক্ষণ না থাকায় ৯০ দশক থেকে পিকনিক স্পটটিতে দর্শনার্থীদের ভ্রমণে ভাটা পড়ে। এক পর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী বিনোদনকেন্দ্রটি ভরে যায় গাছ-পালা আর ঝোপঝাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা এবং পরিবেশবাদীরা বারবার প্রশাসন ও সড়ক ও জনপদ বিভাগের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী পিকনিক কর্নারটির জৌলুস ফিরাতে ভুমিকা রাখতে। কিন্তু তাদের সেই দাবি পুরণ হয়নি। এখন পার্কটির পশ্চিম পাড়ের দেয়াল ভেঙ্গে ১০ বিঘা জমির উপর বসানো হচ্ছে ওজন স্কেল। নির্মাণ কাজ শেষের পর ওজন স্কেল চালু হলে সেখানে প্রতিনিয়ত পরিবহন দাঁড়ানো এবং পার্কিংয়ের ফলে পাখ-পাখালিসহ পার্কটির প্রাকৃতিক পরিবশে বিনষ্ট হওয়ার আশাঙ্কা করা হচ্ছে।

সড়ক ও জনপদ বিভাগ বলছে, ‘ওয়েট স্কেল’ নির্মাণের জন্য চলতি মাসেই কার্যক্রম শুরু হবে। সারাদেশে মহাসড়কগুলোতে অতিরিক্ত চাপ কমাতে ২৭টি জেলায় ২৭টি স্থানে সড়কে ‘ওয়েট স্কেল’ বসানোর সিন্ধান্ত নেয় সড়ক ও জনপদ বিভাগ। সরাসরি বাংলাদেশ সড়ক ও জনপদ বিভাগ প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলাগুলোতে ‘ওয়েট স্কেল’ স্থাপনে কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে যশোর-খুলনা মহাসড়কের ক্ষণিকা পিকনিকের পাশে ২৮ কোটি টাকা ব্যায়ে ওয়েট স্কেল বসানোর সিন্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে মাটি পরীক্ষা ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। যশোরের ‘ওয়েট স্কেল’ স্থাপনের জন্য ৮ একর জমির ডিজাইন করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষণিকা পিকনিক কর্নার থেকে নেয়া হবে ১০ একর জমি। বাকী জমি সড়কের পাশ থেকে অধিগ্রহন করা হবে। এখানে ‘ওয়েট স্কেল’ বসালে যশোর-খুলনা অঞ্চলের সড়কগুলো পরিবহনে অতিরিক্ত চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে।

এদিকে, সড়ক ও জনপদের এমন আত্মঘাতি সিদ্ধান্তে উদ্যোগের ফুঁসে উঠেছে যশোরের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। প্রতিবাদ জানিয়ে ইতোমধ্যে সংশিষ্টদের সাথে মতবিনিময়, স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। শনিবার সকালে যশোর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ব্যানারে পিকনিক কর্নারের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সংগঠনটি। এতে সংহতি প্রকাশ করে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। স্থানীয়রাও অংশ নেয়।

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ সড়ক ও জনপদের এ উদ্যোগ তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা যেকোন মূল্যেই ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণারকে রক্ষার প্রয়োজনে আইনি লড়াইয়ের সঙ্গে যশোরের সকল রাজনীতিক সামাজিক সংগঠনগুলো নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে গড়ে তোলার হুশিয়ারিও দেন। মানববন্ধনে যশোর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক মাস্টার নুর জালাল বলেন, যেকোন মূল্যেই ক্ষণিকা পিকনিক কর্নারকে রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে যশোরের সকল রাজনীতিক সামাজিক সংগঠনগুলো নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়া হবে। মানববন্ধনে পঞ্চাশোর্ধ্ব সালেক বলেন, আমাদের জন্মের আগে থেকে এই পিকনিক কর্নার দেখছি। আগে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ গাড়ি নিয়ে এখানে পিকনিক করতে আসতো। এখন এটির অযত্ন অবহেলার কারণে পরিবেশ খারাপ হয়ে গেছে। আমাাদের দাবি, সরকার এটি জীববৈচিত্র নষ্ট না করে রক্ষাণাবেক্ষণ করুক। যশোর নাগরিক অধিকার

আন্দোলনের সমন্বয়ক মাসুদুজ্জামান মিঠু বলেন, সারাবিশ্বে তথা বাংলাদেশে শত শত কোটি টাকা খরচ করে পরিবেশ উন্নয়নে কাজ হচ্ছে। সেখানে যশোরের ঐতিহ্যবাহী এবং পরিবেশের জন্য উপকারী স্থান নষ্ট করার পায়তারা করা হচ্ছে। এই পিকনিক কর্নারের জলাশয়ে ও গাছগাছালিতে পানকৌড়ি, বক, হাসপাখিসহ ছোট বড় প্রাণী বসাবস করে। এমন একটা জায়গা নষ্ট করে কিভাবে ওজন স্কেল নির্মাণ করে কিভাবে। ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণার জীব-বৈচিত্র অক্ষুন্ন রেখে আধুনিক করার জন্য দাবি জানান তিনি। সড়ক ও জনপদের এই সিদ্ধান্ত যশোরবাসী মেনে নেবে না। আমরা আশা করি, সড়ক ও জনপদ বিভাগ দ্রুত এই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসবে।

এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপদ বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ক্ষণিকা পিকনিক কর্নারের জীব-বৈচিত্র যাতে বিনষ্ট না হয় সেই কারণেই সব জমি নেওয়া হচ্ছে না। যশোরবাসী না চাইলে আমরা বসাবো না। তাছাড়া এটি যশোর অফিস বাস্তবায়ন করছে না। আমরা বিষয়টি নিয়ে সংশিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছি। মানববন্ধনে উপস্থিত আরো উপস্থিত ছিলেন, সেবা সংগঠনের সভাপতি মাস্টার আশরাফুজ্জামান বাবু, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সদস্য আহসানউল্লাহ ময়না, মোবাশ্বের হোসেন বাবু, এ পি পি অ্যাডভোকেট আবুল কায়েস, লিপা খাতুন, অ্যাডভোকেট সেতারা খাতুন, রাইটস যশোর এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, কামরুজ্জামান চৌধুরী প্রমুখ।