বহতা ভৈরব পেতে বাধা ৫১ ব্রিজ-কালভার্ট

242

প্রণব দাস :
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত ভৈরব নদ খনন (ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প) কাজ প্রায় শেষের পথে। ফলে মৃতপ্রায় ভৈরব নদ কিছুটা হলেও জীবন ফিরে পেয়েছে। ইতোমধ্যে শহরের অদূরে খনন করা ভৈরবে শুরু হয়েছে মৃদু জোয়ার-ভাটা। তবে নদীর উপর দিয়ে বিভিন্ন সংস্থার নির্মিত ৫১টি অপরিমিত, অপ্রশস্ত ব্রিজ ও কালভার্ট অপসারণ না করলে এ খনন কাজের পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না বলেই অভিমত দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। নদ খননের যাতে পুরোপুরি সুফল পাওয়া যায় সেজন্য অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্টগুলো সরিয়ে নতুনভাবে নির্মাণের জন্য স্ব স্ব দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছেন কর্মকর্তারা। বর্তমানে নদের শহরাংশের কিছু অংশ খননসহ খননের মাটি অপসারণ ও নদের দুইপাড়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ চলছে।

জেলা কালেক্টরেটের অমিত্রাক্ষর সভাকক্ষে রোববার ২১ আগস্ট ২০২২ সকালে অনুষ্ঠিত যশোর জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক ভৈরব নদকে যথাযথ প্রবাহমান এবং পানি দূষণ ও নদ ভরাট বন্ধে কোন প্রকার বর্জ্য না ফেলার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আবারও নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, বিশাল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে ভৈরব নদ খনন করা হচ্ছে। এ নদ যদি প্রবাহমান না হয় তবে সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা অপচয় হয়ে যাবে; যা কারও কাম্য হতে পারে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যশোর অফিস সূত্রে জানা গেছে, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ৫১টি ব্রিজ-কালভার্ট ভৈরব নদের গলা চেপে ধরেছে। এর মধ্যে যশোর সদরে রয়েছে ৩৪টি, চৌগাছা উপজেলায় ১৬টি এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় একটি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ম্যাপ অনুযায়ী নদের প্রস্থ শহরে ১৫০ মিটার এবং শহরের বাইরে ৩০০ মিটার। কিন্তু ব্রিজ-কালভার্ট করা হয়েছে ১২ থেকে ৭০ মিটার পর্যন্ত। এতে নদীর গতিপথ যেমন পাল্টেছে, তেমনি দখল ও দূষণ হয়েছে সমানতালে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্টের কারণে ব্যাহত হয়েছে খনন কাজও।
এ বিষয়ে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহীদুল ইসলাম বলেন, ভৈরব নদে ৫১টি অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি অপসারণ করা জরুরি। তা না হলে ভৈরব খননের যে সুফল তা পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। তবে এ ব্রিজ-কালভার্টগুলো সওজ, এলজিইডি, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্টদের এগুলো অপসারণের জন্য প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। তারা যদি খুব দ্রুতই কোনো ব্যবস্থা না নেন; সেক্ষেত্রে আমরা সেকেন্ড ফেজ হিসেবে আরেকটি প্রকল্প দাখিল করে এ ব্রিজগুলোকে সম্প্রসারণ করে দেব।
ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সংস্থার নির্মিত অপরিমিত ও অপ্রশস্ত ৫১টি ব্রিজ বা কালভার্টের মধ্যে রয়েছে যশোর চৌগাছায় তাহেরপুর রিসোর্ট ব্রিজ, বাড়ি বটতলা কালভার্ট, লক্ষ্মীপাশা কালভার্ট, আরজি সুলতানপুর, দেবীপুর, বিএডিসির সুলতানপুর,ছোট নিয়ামতপুর, পাতিবিলা ব্রিজ, মুক্তাদহ, ইছাপুর, ভবানিপুর, ঝিনাইকুণ্ডু, মারুয়া, নতুন মারুয়া, নিত্যান্দীর ব্রিজ, ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের গৌরীনাথপুর ব্রিজ, যশোর সদরের শমসের নগর ব্রিজ, ঘোপের ব্রিজ, মাশলিয়া, ঝনঝনিয়া, ঝনঝনিয়া সমসপুর, মথুরাপুর, মানিকদিহি, হৈবৎপুর, হৈবৎপুর রেলওয়ে ব্রিজ, খোজারহাট, বিজয়নগর মধ্যপাড়া কালভার্ট-১ ও ২, শানতলা ব্রিজ, খয়েরতলা ব্রিজ, ডাকাতিয়া রাস্তার কালভার্ট- ১ ও ২, আরসিসি গার্ডার ব্রিজ, বিরামপুর বাবলাতলা, দড়াটানা, কাঠেরপুল, ঢাকারোড, বেলতলা, ঝুমঝুমপুর লিচুতলা ব্রিজ, নীলগঞ্জ সেতু, রাজারহাট/কচুয়া ব্রিজ, দায়তলা/ভগবতিতলা, ঘোপের ব্রিজ কাচারিভাগ, ভায়না ঘোপ, ছাতিয়ানতলা রূপদিয়া ব্রিজ, মাথাভাঙ্গা ব্রিজ, ঘুনী ব্রিজ ও বসুন্দিয়া ব্রিজ। এসব ব্রিজ/ কালভার্টগুলোর মধ্যে এলজিইডির ২৩ টি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের ১৯টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের চারটি, বিএডিসির ৩টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ১টি ও রেলওয়ের একটি।
উল্লেখ্য, গঙ্গার শাখা নদী জলাঙ্গি থেকে উৎপত্তি ভৈরব নদের। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা হয়ে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে এ নদ। বৃটিশ শাসনামলে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় নদীর তীরে চিনিকল নির্মাণ ও রেললাইন তৈরি করতে গিয়ে সংকীর্ণ করে ফেলা হয় ভৈরব নদকে। এরপর অপরিকল্পিত বাঁধ, কালভার্ট, সেতু নির্মাণের পাশাপাশি অবৈধ দখলের কারণে ধীরে ধীরে নাব্য হারাতে থাকে নদটি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার মৃতপ্রায় এ নদে জোয়ার-ভাটা ফেরাতে খনন কাজের উদ্যোগ নেয়। এরপর যশোরের চৌগাছা উপজেলার তাহেরপুর থেকে নওয়াপাড়ার আফরাঘাট পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার খনন কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে ৯৪ কিলোমিটার নদের খনন শেষ হয়েছে। ফলে গত কয়েক মাস ধরে মৃদু জোয়ারভাটা দেখতে পাচ্ছেন শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের জনগোষ্ঠী। এখন চলছে যশোর শহরাংশের খনন কাজ। এ কাজ শেষ হলে প্রায় শত বছর পর ভৈরব নদে জোয়ার ভাটা দেখবে যশোর শহরবাসীও। শুধু তাই নয়, এর ফলে এ অঞ্চলের আরও কয়েকটি নদী ও ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের নতুন দিগন্ত উম্মোচন হবে।
নদী পাড়ের মানুষরা জানান, ছয় থেকে সাত মাস হবে নদীতে জোয়ারভাটা চলছে। যদি পরিপূর্ণভাবে এ নদীকে খনন করা হয় তাহলে যশোরের মানুষ উপকৃত হবে। সেইসঙ্গে নদীতে আবারও লঞ্চ ও স্টিমার চলাচল শুরু করবে।
যশোর ভৈরব নদ সংগ্রাম পরিষদের নেতা ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, নদীতট আইন না মেনেই ভৈরব নদ খনন কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তারা নদকে খালে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, পদ্মা মাথাভাঙার সাথে অর্থাৎ উজানের সাথে যদি এ নদের সংযোগ না দেয়া হয় এবং ভৈরবের উপর থাকা অপরিকল্পিত ব্রিজ কালভার্ট অপসারণ না হলে এ নদ খননের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। তবে তিনি বলেন, নদীতট আইনে নদী খননের পরে এখানকার মানুষের জীবনে নতুন গতি ফিরে আসবে; সেই সঙ্গে জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসন হবে।
উল্লেখ্য, যশোরবাসীর লাগাতার আন্দোলনের কারণে সরকার ভৈরব নদ সংস্কারে প্রকল্প হাতে নেয়। প্রধানমন্ত্রী এক পর্যায়ে নদটি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৭২ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে। শুরু হয় পাঁচ বছর মেয়াদী ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’। এ প্রকল্পের আওতায় ৯৬ কিলোমিটার নদ খনন কাজ শুরুর তারিখ ছিল ২০১৯ সালের ৬ আগস্ট ও কাজ শেষ হবার তারিখ বেঁধে দেয়া হয়েছিল ২০২০ সালের ২০ জুন। কিন্তু দৃশ্যমান তেমন কোন কাজ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তারপরও এ খনন কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয় দফায় ভৈরব নদ খননের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয় ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত।
এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আনিছুজ্জামান জানান, খয়েরতলা ও রাজারহাট ব্রিজ অপসারণ করে নতুন ব্রিজ নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হলেও জমি সংক্রান্ত জটিলতায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এ বিষয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির জমির দাবিদারদের অবহিত করা হয়েছে। জমি বিষয়ে দাবির আইনি জটিলতা মুক্ত হলেই এ ব্রিজ নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম জানান, আপাতত রাজারহাট ব্রিজ অবমুক্ত হলেই আগামী দু’মাসের মধ্যে যশোর শহর এলাকার এ নদে জোয়ার-ভাটা দেখা যাবে। তিনি আরও বলেন, নদে অবস্থিত ছোট ছোট ব্রিজ- কালভার্টের স্থলে নদের প্রস্থ অনুযায়ী সেতু নির্মাণের অন্য কোন বিকল্প নেই। অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্টগুলো সরিয়ে নতুনভাবে নির্মাণের জন্য স্ব স্ব দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।