হুমকির মুখে যশোরের ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণার

71
হুমকির মুখে যশোরের ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণার

নিজস্ব প্রতিবেদক :
যশোর-খুলনা মহাসড়কের গা ঘেসে সদর উপজেলার রামনগরে অবস্থিত ‘ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণার। বিশাল দিঘী আর জীব-বৈচিত্রের সমন্বয়ে গড়ে উঠা পিকনিক কর্ণারটি এক সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল ছিল। অথচ গত দুই দশকের ব্যবধানে কর্ণারটি অযত্ন আর অবহেলায় পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পিকনিক কর্ণারটির জৌলুস ফেরাতে ভূমিকা না রেখে এখন সামনের অংশ ভেঙ্গে যানবাহনের ‘ওয়েট স্কেল’ স্থাপনের সিন্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরিবহন দাঁড়ানো এবং পার্কিংয়ের ফলে বিপন্ন প্রজাতির পাখ-পাখালি, জীব-বৈচিত্র ও পিকনিক স্পটের আবহ বিনষ্ট হবার আশংকা করছেন পরিবেশবাদীরা। তারা বলছেন, সড়ক ও জনপদ বিভাগের এমন সিন্ধান্ত বাতিল করে ছয় দশকের পিকনিক কর্ণারটি আধুনিক করতে হবে। তাতে যশোরের এ ঐতিহ্যবাহি এ স্থানটি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি সুস্থ বিনোদনের এ স্থানটির কদরও বাড়বে।
সংশ্রিষ্ঠ সূত্র ও সড়ক ও জনপদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে অবাঙ্গালী প্রকৌশলী ফারুকির উদ্যোগে ৫৬ বিঘা জমির উপরে প্রতিষ্ঠিত হয় যশোরের ঐতিহ্য ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণার। যা যশোরবাসীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানে বিশাল দিঘী ছাড়াও রয়েছে নানা ধরনের গাছ-গাছালি ও জীববৈচিত্র। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই জৌলুস হারাতে থাকে ক্ষণিকা। এ অবস্থায় ৯০ দশকে এসে উৎসাহে ভাটা পড়ে দর্শনার্থীদের মাঝেও। এক পর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী বিনোদনকেন্দ্রটি ভরেযায় গাছ-পালা আর ঝোপঝাড়ে। ২০ বছরের বেশি হয়ে গেছে এখানে আর কেউ পিকনিক করতে যান না। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা এবং পরিবেশবাদীরা বারবার প্রশাসন ও সড়ক ও জনপদ বিভাগের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী পিকনিক কর্ণারটির জৌলুস ফিরাতে ভুমিকা রাখতে। কিন্তু তাদের সেই দাবি পুরণ হয়নি।

এখন পার্কটির পশ্চিম পাড়ের দেয়ালের ৪ একরের অংশ ভেঙ্গে ফেলে বসানো হচ্ছে ওজন স্কেল। নির্মাণ কাজ শেষের পর ওজন স্কেল চালু হলে সেখানে প্রতিনিয়ত পরিবহন দাঁড়ানো এবং পার্কিংয়ের ফলে পাখ-পাখালিসহ পার্কটির প্রাকৃতিক পরিবশে বিনষ্ট হওয়ার আশাঙ্কা করা হচ্ছে।
সুত্রমতে, ‘ওয়েট স্কেল’ নির্মাণের জন্য চলতি মাসেই কার্যক্রম শুরু হবে। সড়ক ও জনপদ বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ সমাজের কথাকে জানান, সারাদেশে মহাসড়কগুলোতে অতিরিক্ত চাপ কমাতে ২৭টি জেলায় ২৭টি স্থানে সড়কে ‘ওয়েট স্কেল’ বসানোর সিন্ধান্ত নিয়েছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। সরাসরি বাংলাদেশ সড়ক ও জনপদ বিভাগ প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলাগুলোতে ‘ওয়েট স্কেল’ স্থাপনে কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে যশোর-খুলনা মহাসড়কের ক্ষণিকা পিকনিকের পাশে একটি বসানোর সিন্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে মাটি পরীক্ষা ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। যশোরের ‘ওয়েট স্কেল’ স্থাপনের জন্য ৮ একর জমির ডিজাইন করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণার থেকে নেয়া হবে ৪ একর জমি। বাকী জমি সড়কের পাশ থেকে অধিগ্রহন করা হবে। এখানে ‘ওয়েট স্কেল’ বসালে যশোর-খুলনা অঞ্চলের সড়কগুলো পরিবহনে অতিরিক্ত চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে।
এদিকে, স্থানীয়রা বলছেন, অযত্ন আর অবহেলায় ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণার পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে আর কেউ যান না সেখানে। এ অবস্থায় তারা চান আবারো তার জৌলুস ফিরে পাক ক্ষণিকা। সংস্কার করলে এটি আবারো দর্শনীয় হয়ে উঠবে বলেও আশা তাদের।
পিকনিক কর্ণারের একটু দূরে চা বিক্রি করেন সুলতান হোসেন। তিনি বলেন, ‘একসময় ক্ষণিকায় ছেলে-মেয়েরাসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আসতো। মানুষের ভিড়ে জমজমাট থাকতো স্থানটি। সেই পরিবেশ এখন আর নেই। আমরা চাই, সরকার আবার এই পিকনিক কর্ণারটি চালু করুক।’ তিনি আরো বলেন, ‘শুনছি এখানে ওয়েট স্কেল বসানো হবে। এখানে বিপন্ন প্রজাতির পাখ-পাখালির বসবাস। ওজন স্কেল বসালে গাড়ি পার্কিংসহ নানান শব্দে পার্কটির প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হবে। তখন আর পাখ-পাখালিও বসবাস করবেনা। আমাদের দাবি, ওয়েট স্কেল এখানে না বসিয়ে একটু সামনে বসানো হোক ।’
তৌফিকুর রহমান নামে আরেক চা বিক্রেতা বলেন, ‘আগে কর্ণারটির কারণে ব্যবসা হতো আমাদের। পার্কের মধ্যে ফেরি করে খাবার বিক্রি করতাম। দর্শক না আসায় তা বন্ধ করে চায়ের দোকান দিয়েছি।’ বিনোদন কেন্দ্রটি চালু করা হলে স্থানীয় ব্যবসা বাণিজ্যেও সুদিন ফিরে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে, ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণার জীব-বৈচিত্র অক্ষুন্ন রেখে আধুনিক করার জন্য বিভিন্ন সময় দাবি জানিয়ে আসছেন ‘নাগরিক অধিকার আন্দোলন’ যশোরের নেতৃবৃন্দ। সংগঠনটি বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার মিটিংও করেছে। গত ৭ জুন ও গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর একই দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করেন নাগরিক অধিকার আন্দোলন যশোরের নেতৃবৃন্দ। এই বিষয়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের যশোরের সমন্বয়ক শেখ মাসুদুজ্জামান মিঠু বলেন, ‘ক্ষনিকা পিকনিক কর্ণার যশোরবাসীর ঐতিহ্য। এখানে নানা জাতের গাছ-গাছালির সঙ্গে বিভিন্ন পাখির অভরায়ণ্য। যেখানে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ জীববৈচিত্র রক্ষা করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সেখানে সড়ক ও জনপদ বিভাগ না করে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পার্কটির পশ্চিম পাশের দেয়ালের ৪ একরের অংশ ভেঙ্গে ফেলে বসানো হচ্ছে ওজন স্কেল। ফলে প্রতিনিয়ত এখানে পরিবহন দাঁড়ানো এবং পার্কিংয়ের ফলে পাখ-পাখালির বৈচিত্র বিনষ্ট হবে। আমরা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছি। তাদের এই সিন্ধান্ত যশোরবাসী মেনে নেবে না। আমরা আশা করি, সড়ক ও জনপদ বিভাগ দ্রুত এই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসবে।’
এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপদ বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ক্ষণিকা পিকনিক কর্ণারের জীব-বৈচিত্র যাতে বিনষ্ট না হয় সেই কারণেই সব জমি নেওয়া হচ্ছে না। পিকনিক কর্ণারটি চালু করতে সড়ক ও জনপথ বিভাগও আগ্রহী। আর্কিটেক্ট দ্বারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে একটি আধুনিক পিকনিক স্পট গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।