২২ শ্রাবণ : কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস

2

প্রণব দাস :
বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক মানবসভ্যতার অগ্রগণ্য মনীষী এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের মধ্যে অন্যতম মরণজয়ী ‘সার্বভৌম’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮১তম মহান প্রয়াণ দিবস ২২ শ্রাবণ আজ। ১৩৪৮ সালের এ দিনে তিনি ৮০ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকার জাতীয় সংগীত রচয়িতা অমরত্ব পাওয়া মরণজয়ী এ বিরল প্রতিভা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ রাত আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে কোলকাতার জোড়াসাঁকো দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের ৬নং বাড়িতে ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদা দেবীর ১৫ সন্তানের মধ্যে ১৪তম সন্তান ও অষ্টম পুত্র।
নোভেল জয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম কোলকাতায় হলেও ঠাকুর পরিবারের আদি বাসস্থান বৃহত্তর যশোর। তাই এ মহামানবকে ঘিরে ২৫ বৈশাখ ও ২২ শ্রাবণ যশোরবাসীর মন ও মননে আবেগ, উচ্ছ্বাস ও প্রাণের টান অনেক গভীর ও মমতার।
প্রতিটা মানুষের জন্য সৃষ্টিশীল, শান্তিবাদী ও মহিমান্বিত হওয়ার অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। তাঁর নানাবিধ অনুপম মৌলিক সৃষ্টির মধ্যে সংগীত অন্যতম। তাঁর রচনায় বাংলা গানের ভান্ডারে সওয়া দুই হাজার গান যুক্ত হয়েছে। এ গান নিয়ে কবি আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেই বলেছেন, ‘নস্বর এই পৃথিবীতে আমি বেঁচে থাকবনা। কিন্তু যদদিন বাঙালি থাকবে ততদিন আমার গান বেঁচে থাকবে। কারণ আমার গানের মাঝে বাঙালি খুঁজে পাবে নিজের সকল কাজের প্রেরণা’।
এ বিশ্বাসকে সার্থক করে তাঁর মহাপ্রয়ানের এত বছর পেরিয়ে গেলেও কবি বেঁচে আছেন প্রতিটা বাঙালীর হৃদয়ে মন ও মননে।
“রবীন্দ্রনাথ বাঙালীর সংগ্রামে, শান্তিতে, উৎসব- আনন্দে নানা অনুষ্ঠানে এমনকি দিকভ্রান্ত জীবনেও দিকদর্শী ধ্রুবতারা। সংস্কৃতি সচেতন মানুষের রক্তের মধ্যে তিনি মিশে আছেন লবন ও চিনির মত”। সাহিত্য, সংগীত, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, নৃত্য অভিনয় সকল ক্ষেত্রেই মৌলিকতায় অবাধ বিচরণ করে তিনি মানবসভ্যতা বিকাশে স্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন।
রাজনৈতিক, সামাজিক পরিবর্তনের সাথে এবং ঘটনা প্রবাহের সাথে নিজেকে একাত্মা করে তিনি বয়সের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকার গান রচনা করেছেন। শেষ বয়সে সকল প্রকার সংস্কারমুক্ত হয়ে তিনি কিছু গান রচনা করেন। তাঁর গানের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতি, প্রেম, স্বদেশ, পূজা, বিচিত্র আর আনুষ্ঠানিক পর্যায়।

১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আগে ও পরে তিনি যে সব গান রচনা করেছেন তার অধিকাংশই স্বদেশ পর্যায়ের গান এবং এর মধ্যে বেশ কিছু বাউল সুরের। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ ছাড়াও ‘ও আমার দেশের মাটি’ ইত্যাদি গান এ সময়কার রচনা। তাঁর রচিত গানের সুর ও বানীর অপূর্ব মিলন মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে।

সবাক চলচ্চিত্র শুরু হওয়ার যুগে রবীন্দ্রসংগীত প্রথম ব্যবহৃত হয়। তার পথ ধরেই দ্রুত প্রসারিত হয় আধুনিক গান রচনার ক্ষেত্র। তাই অনেক সংগীত বিশেষজ্ঞরা তাকে আধুনিক গানের জনক বলে মনে করেন। এছাড়া গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য রচনা তার আর এক অনবদ্য সৃষ্টি। এসব নাট্যে তিনি একদিকে যেমন বিদেশী সুরের মূর্চ্ছনা এনেছেন, অন্যদিকে মনিপুরের মত অবহেলিত পাহাড়ী অঞ্চলের নৃত্য ও গানকে সমাজে তুলে ধরে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এদিকে ২২ শ্রাবণ ঘিরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতি বছর নানা অনুষ্ঠান থাকলেও এবছর জেলা শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন কোন আয়োজন করছেন না বলে জানিয়েছেন তারা। তাই ভার্চুয়াল মাধ্যম ছাড়া অনেকটা নিরবে পালন করা হবে এ মনীষির মহাপ্রয়াণ দিবস।