দখলদার রেখেই শেষ ভৈরব নদ খনন

1

নিজস্ব প্রতিবেদক :

# সরকারের নীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন
# দেড়শতাধিক অবৈধ স্থাপনা বহাল
# সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও চলছে দখলদার রেখেই

শেষ হয়েছে ভৈরব নদের খননকাজ। তবে যশোর শহরের দড়াটানায় পূর্ব প্রান্তের দেড়শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করায় খনন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নদ সংস্কার আন্দোলনের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টরা বলছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড সরকারের নীতির প্রতি বৃদ্ধাআঙ্গুল দেখিয়ে তাদের ডিজাইন অনুযায়ীও এই ভৈবর নদ খনন করেনি। বরং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড দখলকারীদের স্থাপনা রক্ষা করতে গিয়ে খননের নামে নদ উল্টো খালে পরিণত করেছে। এজন্য এই খননকাজ কাজে আসবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, আমরা অনেক দখলদার উচ্ছেদ করেছি। ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হলে জেলা প্রশাসন আর পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে বাকিদেরও উচ্ছেদ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১৬ সালে ২৭২ কোটি টাকার ৯২ কিলোমিটার নদ খনন প্রকল্প গ্রহণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। শুরু হয় পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’। শহর অংশের চার কিলোমিটার এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ছাড়া খননকাজ করা সম্ভব ছিল না। এজন্য জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে নদের দু’ধারে জেলা প্রশাসনের খাসজমি এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগের জমিতে গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করে প্রশাসন। সবমিলে ভৈরব নদের গর্ভে ও তার পাড়ে সরকারি জমিতে গড়ে তোলা ২৯৬ অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি উচ্ছেদের চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়। নোটিশ পাওয়ার পরদিনই বেশ কয়েকজন নিজেদের বৈধ মালিক দাবি করে জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেন। পরে তারা উচ্ছেদ বন্ধে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। সবশেষ ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ ৮৪টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রশাসন। কিন্তু পূর্ব প্রান্তের অবশিষ্ট দেড় শতাধিক অবৈধ স্থাপনা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। গত তিন বছরে এই উচ্ছেদ নিয়ে সাড়া শব্দও মিলেনি। সেই দখলদার রেখেই ভৈরব খনন শেষ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এমনকি নদের দুই ধারে হাঁটার ও সৌন্দর্যবর্ধন করার কাজ চলছে দখলদার রেখেই।
সূত্রমতে, ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই নিজেদের ওয়েবসাইটে এসব দখলদারদের তালিকাটি প্রকাশ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। যশোর সদরে ভৈরব দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা সেই তালিকায় রয়েছে দড়াটানা হাসপাতাল, মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কমটেক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দেশ ক্লিনিক, একতা ক্লিনিক, অর্থোপেডিক ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জনতা সুপার মার্কেট, সম্রাট সুজ, প্রাইম সুজ, ছিট বিতান, এ্যানি সুজ, একতা ক্লথ স্টোর, তাসলিমা টেলিকম, মাংসের দোকান, বিভিন্ন চায়ের দোকান, বাসাবাড়িসহ অন্যান্য স্থাপনা। কিন্তু এ দখলদারদের কেউ উচ্ছেদ হয়নি। উপরন্তু এসব দখলদারসহ পাড়ের ক্লিনিক ও হাসপাতালের বর্জ্য নদে ফেলে নদ দূষণ করা হচ্ছে।
ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ সমাজের কথাকে বলেন, ‘আন্দলনের ভিতর দিয়েই ভৈরব নদ খননের প্রকল্প গৃহীত হয়। এই নদই হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান নদী প্রবাহ। সেই দিক থেকেই এই নদীটা যথাযত খনন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা শুরু থেকেই সংশয়ে ছিলাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতীত কার্যকলাপ দেখে। আদৌ সঠিকভাবে এই নদী খনন হবে কি না। আমাদের সেই সংশয় সত্যি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজাইন অনুযায়ীও এই ভৈবর নদ খনন হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সরকারের নীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়েছে। পানি উন্নয়নের কালক্ষেপণে নদীর দুই পাড়ের দখলদাররা দুইভাবে সুবিধা নিচ্ছে। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল জেলা প্রশাসনের সেটা তারা নেয়নি। শহরের বাইরের অংশের দখলদারদের উচ্ছেদ করা গেলেও শহর অংশের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছে করা হয়নি। বরং নদী আইন ব্যাহত করে নদীর ভিতরেই খননের মাটি রেখেছে। যা আবার এই মাটি দিয়েই নদী ভরাট হয়ে যাবে। যশোরের মানুষ বিক্ষুব্ধ, আমরা চোখের সামনেই দেখছি, নদীর দুই পাড়ের যা বাড়িঘর আছে, লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করছে। অথচ তাদের স্যুয়ারেজ লাইন সব এই নদীর ভিতরে। ফলে পানি দূষণের যে সংকট সেটাও লক্ষ্য করছি। এসবের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটা জেলা প্রশাসন নিচ্ছে না। সঠিক আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়া হয়; তাহলে নদ সংস্কারের প্রশ্ন, জনগণের স্বার্থের যে প্রশ্ন সব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন দেখছি নদীর দুই পাড় দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে; সেখানেও দখল উচ্ছেদ যথাযথভাবে করা হয়নি। অর্থাৎ ক্ষমতা দুর্নীতি মিলিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত এই প্রকল্প যে নয়ছয় করা যায় সেটা পানি উন্নয়ন বোর্ড করে দেখালো।
জনউদ্যোগ যশোরের সদস্য ও যশোরের প্রবীণ সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহ্ বলেন, ভৈরব রক্ষায় জনউদ্যোগের পক্ষ থেকে বহুবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। আমাদের দাবি ছিল প্রথমে দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে। এরপর নিয়মমাফিক ভৈরব খনন করে সৌন্দর্যবর্ধন করা। কিন্তু দখলদার উচ্ছেদ করা হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। নদ খননে যারা অনিয়ম দুর্নীতি করেছে তাদেরকে নদী আইনে আইনের আওতায় আনা উচিত।
এ বিষয়ে পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহীদুল ইসলাম বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে তারা খনন শেষ করার চেষ্টা করছেন। নানা কারণে সেটা হয়ে উঠেনি। খননকাজ শেষ বলা চলে। তবে ওয়াকওয়ে, সৌন্দর্যবর্ধন কাজ বাকি রয়েছে। সম্প্রতি ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; দ্রুতই এই কাজ শুরু হবে। দখলদার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা অনেক দখলদার উচ্ছেদ করেছি। ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হলে জেলা প্রশাসন আর পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে বাকিগুলোদের উচ্ছেদ করা হবে।