শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশু

‘শিশুরা ডিজিটাল ডিভাইসের দিকে ঝুঁকে পড়ায় তারা দুটি ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। প্রথমত, তাদের সামাজিক দক্ষতা কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে মেশার ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কৌশলগুলো তারা রপ্ত করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, খেলাধুলার অভাব ও শারীরিক অনুশীলন না থাকায় শারীরিক গঠন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এজন্য তারা সুঠামদেহী হয়ে গড়ে উঠছে না।’ – ইসমত আরা, মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক

ইমরান হোসেন পিংকু: যশোর শহরের আরবপুর এলাকায় বাড়ি পিয়াঙ্কা বিশ্বাসের। তিনি একজন গৃহিণী। তার স্বামী রিপন হোসেন পেশায় ব্যাংক কর্মকর্তা। তাদের দুই সন্তান। একজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, অন্যজনের বয়স আট মাস। বড় মেয়ে বাড়িতে যতসময় থাকে ততক্ষণ মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। কার্টুন দেখে, গেম খেলে। আর আট মাস বয়সের ছেলেকে খাওয়ানোর সময় মোবাইলে ভিডিও না দেখালে সে খেতে চায় না।

পিয়াঙ্কা বিশ্বাস বলেন, ‘সন্তান নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। বাচ্চারা মোবাইল এক মুহূর্তে হাত থেকে ছাড়তে চায় না।’ শুধু পিয়াঙ্কার সন্তান নয়। শহরের প্রায় সব শিশুই স্মার্টফোনে আসক্ত।

ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন শিশু। প্রতিদিন এক লাখ ৭৫ হাজার অর্থাৎ প্রতি আধা সেকেন্ডে একজন শিশু নতুন করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ২৫ শতাংশের বয়সই ১০ বছরের কম। ফেসবুকসহ সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ার ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়সই ১৮ থেকে ২৯-এর মধ্যে।

ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ মনিরা হাসান বলেন, শিশুদের ডিভাইস আসক্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের জন্য বিনোদন স্পেস তথা খেলার মাঠ নাই। বিশেষ করে শহরগুলোতে এই সমস্যা বেশি। তাই তারা ডিভাইসকেই বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে।’

যশোর ২৫০শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ মাহফুজুর রহমান বলেন, খাওয়ানোর সময় শিশুর ডিভাইস আসক্তি এটা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর। মানুষ যখন কোনো খাবার খায় সেটা খাওয়ার আগে তার মুখে এক ধরনের তরল নিঃসৃত হয়। যা হজমে সাহায্য করে। বাচ্চারা যখন মোবাইলে ভিডিও দেখতে দেখতে খায় তখন তাদের মনোযোগ থাকে মোবাইলের দিকে। তাই খাওয়ার সময় মুখের সেই তরল নিঃসৃত হয় না। এতে হজমের সমস্যা হয়। যা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর।’

তিনি আরো বলেন, ‘ডিভাইস আসক্তি শিশুদের অনেক বড় সমস্যা। একটা শিশুর জন্মের পর থেকেই ব্রেইন ডেভলপমেন্ট শুরু হয়। আমরা তাকে যা শেখাই সে সেটাই গ্রহণ করে। বাচ্চা ছোট থাকতেই যখন তার হাতে আমরা ডিভাইস তুলে দেই। প্রথমে হয়তো কান্না থামাতে অল্প একটু দিলাম, এভাবে ধীরে ধীরে সে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে অভিভাবকদের। না হলে, ডিভাইস আসক্তি থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে শারীরিক মানসিক অনেক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হবে শিশুদের। একটা সময় পুরো প্রজন্ম রোগা হয়ে বেড়ে উঠবে। তাই যে কোনো মূল্যে ডিভাইস আসক্তি দূর করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ মনিরা হাসান বলেন, ‘শিশুদের ডিভাইস আসক্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের জন্য বিনোদন স্পেস তথা খেলার মাঠ নেই। বিশেষ করে শহরগুলোতে এই সমস্যা বেশি। তাই তারা ডিভাইসকেই বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। আর এখন শহরের যারা বাবা-মা আছেন অধিকাংশ পরিবারের দুইজনেই ব্যস্ত থাকে। তাই তারা বাচ্চাদেরকে ওভাবে সময় দিতে পারছে না। এজন্য বাচ্চারা সময় কাটানোর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে বিভিন্ন ডিভাইস বা স্মার্টফোন। গ্রামের থেকে শহরের শিশুরা ডিভাইসে আসক্ত হচ্ছে বেশি। যার অন্যতম প্রধান কারণ বিনোদনের উপযুক্ত স্পেস না থাকা। খেলার মাঠ না থাকায় তারা খেলতে পারছে না। তাই মোবাইলকেই তারা খেলার মাঠ হিসেবে বেছে নিয়েছে।’

যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক ইসমত আরা বলেন, ‘শিশুরা ডিজিটাল ডিভাইসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে অতিমাত্রায়। এতে তারা দুটি ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। প্রথমত, তাদের সামাজিক দক্ষতা কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে মেশার ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কৌশলগুলো রপ্ত করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, খেলাধুলার অভাবে ও শারীরিক অনুশীলন না থাকায় শিশুর শারীরিক গঠন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। যে কারণে তারা সুঠামদেহী হয়ে গড়ে উঠছে না।’

ইসমত আরা আরো বলেন, মূলত দুইটি কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। প্রথমত, খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে। শিশুদের খেলার পরিবেশ থাকছে না। দ্বিতীয়ত, বাবা-মা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে শিশুদের বাইরের খেলায় পাঠাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তবে আরেকটি বিষয় হলো, বাবা-মায়েরা নিজেদের অবসর সময় কাটানোর জন্য সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন ডিজিটাল ডিভাইস। সমাধানের উপায় হিসেবে বলেন, এক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইস এড়িয়ে চলতে হলে শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন শারীরিক অনুশীলন এবং ইনডোর ও আউটডোরে খেলায় মনযোগী করে তুলতে হবে। অন্যদিকে বাড়িতে বয়স্কদের সাথে বেশি বেশি মিশতে দিতে হবে। যাতে করে বাচ্চারা তাদের সাথে গল্প করা, একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া শিখতে পারে। ছবিযুক্ত বইয়ে পড়া দেখিয়ে শিখানো এবং পুরোনো দিনের মতো বউ-পুতুল খেলা করার সুযোগ করে দিতে হবে।’

শেয়ার