মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ‘কমাবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ পদ্মা সেতু চালু হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে বলে আশা প্রকাশ করছেন যশোরের সবজি-মৎস্য-ফুলসহ নানা কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীরা। তারা নিজস্ব উদ্যোগে ঢাকাসহ সারাদেশে কৃষিপণ্য সহজে বাজারজাত করে অধিক লাভ করতে পারবেন বলে আশা দেখছেন। সবজি, ফুল ও মৎস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত জেলা যশোর। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এ জেলার উৎপাদিত ফসল দেশের ৬০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। চাষি এবং ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পদ্মা নদীতে ফেরি পারাপারের কারণে দীর্ঘদিন উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছিলেন না এ অঞ্চলের কৃষকরা। পদ্মা সেতু এসব বঞ্চিত কৃষকদের মুখে হাসি ফুটাবে। তাদের আশা, সেতু চালু হলে উৎপাদিত সবজি অল্প সময়ে রাজধানী ঢাকায় ‘সরাসরি’ পাঠাতে পারবে। এতে ভালো মূল্যে বিক্রি করে নিজেরা লাভবান হতে পারবেন।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরুজ্জামান বলেন, যশোরে রবি, খরিপ-১ ও খরিপ-২ এই তিন মৌসুমে যথাক্রমে ১৬ হাজার, ১৪ থেকে ১৫ হাজার এবং ৬ থেকে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়। এ ধারাবাহিকতায় প্রায় সাড়ে ৮ লাখ মেট্রিকটন সবজি উৎপাদন হয়। যশোরের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিকটন। উদ্বৃত্ত অংশ ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যমুনা সেতু চালু হওয়ার ফলে উত্তরাঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক বিপ্লব ঘটেছে। তেমনি পদ্মাসেতু চালু হলে উত্তরের মতো কৃষি বিপ্লব ঘটবে এই যশোর অঞ্চলেও। সেতু চালুর পরে কৃষকদের গ্রুপ করে তাদের উৎপাদিত সবজি ‘সরাসরি’ বাণিজ্যিকভিত্তিতে বিক্রির উদ্যোগ নিতে কৃষি বিভাগ কাজ করবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন।
যশোরের ঐতিহ্যবাহী সবজি হাট বারোবাজারের পাইকার মনির হোসেন ভুট্টো বলেন, চার ঘণ্টার মধ্যে আমরা ঢাকার যাত্রাবাড়িতে সবজি পৌঁছে দিতে পারবো। এরফলে আমাদের যেমন সময় বাঁচবে, তেমনি সবজি বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা থেকে মুক্ত হবো। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সবজি উৎপাদন করে সঠিক মূল্য পাই না। আমাদের কাছ থেকে পাইকাররা স্বল্পমূল্য দিয়ে সবজি কিনে ঢাকায় উচ্চমূল্যে বিক্রি করে। পদ্মাসেতু চালু হলে আমাদের ক্ষেতের উৎপাদিত সবজি ট্রাকে কয়েকজন মিলে গ্রুপ করে ঢাকায় উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে পারবো। তবে কমদামে রাজধানীবাসীদের সবজি খাওয়াতে সেতুর টোলের রেট কমানোর পক্ষে মতামত দেন তিনি। তার মতে, সেতুর টোল রেট কমলে পরিবহন খরচ কমে আসবে। এতে সহজে ও স্বল্পমূল্যে সবজি পৌঁছানো যাবে ঢাকায়। ক্রেতারাও কমদামে সবজি কিনতে পারবেন।

এদিকে, পদ্মা সেতু চালু হলে ফুলের রাজধানী যশোরের গদখালীর ফুল দ্রুতই পৌঁছে যাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে। ফেরিঘাটের জটে পড়ে নষ্ট হবে না কোনো ফুল। সবজির মতো ফুল চাষিরা ফুল নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ভেঙ্গে সরাসরি ঢাকার বাজারে ফুল বিক্রি করতে পারবেন তারা। দামও বেশ ভালো পাবেন। এতে চাষিরা উপকৃত হবে। তাই সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায় দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের মধ্যে অধীর আগ্রহে ফুলের রাজধানী গদখালী-পানিসারার কয়েক হাজার ফুলচাষিও।

গদখালীর স্থানীয় ফুলচাষি রাজু মিয়া বলেন, দেশের চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ফুল যশোর থেকে সরবরাহ হয়। এই অঞ্চলের প্রায় ১৫শ’ হেক্টর জমিতে ছয় হাজারের মতো চাষি ফুল চাষ করেন। প্রায় সারাবছরই এখান থেকে কমবেশি ফুল পাঠানো হয়। বিশেষ দিন ও উৎসবকে ঘিরে ফুল বেচাকেনার রেকর্ডও হয়। পদ্মা সেতু চালু হলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় ফুল পৌঁছে যাবে ঢাকায়। এতে ফেরিঘাটে আটকে থেকে ফুল নষ্ট হওয়ার আর কোনো ভয় থাকবে না। আবার ফেরিঘাটের অজুহাতে পাইকারদের কম দাম দেওয়ারও দিন ফুরাবে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, সেতু চালু হলে ঘাটের বিড়ম্বনা আর থাকবে না। এতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা ফুল পাঠাতে পারবো। সাধারণত আমরা এখন সবজির ট্রাকে ও যাত্রীবাহী বাসে বান্ডিল করে ফুল পাঠায়। সেক্ষেত্রে বান্ডিল প্রতি এখন খরচ তিনশ’ টাকা। সেতু চালু হলে খরচ হয়তো কিছুটা বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে ফুলের দাম ‘কস্ট অ্যনালাইসিসের’ মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত চাষিরা লাভবান হবে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে রেণু উৎপাদনের জন্য যশোরের চাঁচড়া এলাকা বেশ পরিচিত। প্রতি সপ্তাহে ১০ প্রজাতির চার থেকে পাঁচ হাজার কেজি রেণু এখানে উৎপাদন হয়। স্থানীয় মৎস্যচাষিদের দাবি, দেশে রেণুর মোট চাহিদার অর্ধেকই সরবরাহ করা হয় এই অঞ্চল থেকে। এখানকার চাষিরা আশা করছেন, সেতু চালু হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের শৃঙ্খল ভেঙ্গে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার রেণু বিক্রি করা যাবে। এতে করে ব্যবসার পরিধি বাড়বে, লাভবান হবেন মৎস্যচাষি, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।

যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে প্রায় পাঁচ হাজার মৎস্যচাষি রয়েছেন। পদ্মা সেতু চালু হলে ফেরিঘাটে ভোগান্তি, পোনা বিনষ্ট, পথে পথে চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা পাবো। সেতু চালু হলে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও বরিশালের সঙ্গে ব্যবসা সহজ হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদ্মা সেতুতে টোল বাবদ খরচ পিকআপ প্রতি ৬-৭ শ’ টাকা বাড়বে। তবে পথ কমে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের খরচও কমবে। এছাড়া সড়কের অবস্থা ভালো হওয়ায় পরিবহনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কমে আসবে। তাই পরিবহন খরচ না বাড়ানোর দাবি তোলেন তিনি।

শেয়ার