ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য আরো গতিশীল হবে

 ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য আরো গতিশীল হবেইমরান হোসেন পিংকু ও জাহিদ হাসান: সকাল হলেই কর্মযজ্ঞ শুরু হয় দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর যশোরের বেনাপোলে। বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত কাস্টমস ও শ্রমিক মিলে প্রায় ২০ হাজার কর্মচারী-শ্রমিক ব্যস্ত হয়ে পড়েন আমদানি-রপ্তানির বিভিন্ন কার্যক্রমে। তবে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্যের আমূল পরিবর্তন আসবে বলছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, পদ্মা সেতুকে ঘিরে ঘুরে দাঁড়াবে বন্দর। বাড়বে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ভারত থেকে পণ্য আমদানির পর রাজধানীতে পৌঁছে যাবে ৪-৫ ঘণ্টায়। এতে কমবে সময় ও পরিবহন ব্যয়। তবে পূর্ণ বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে বন্দরটির সক্ষমতা বাড়াতে হবে অভিমত ব্যবসায়ীদের। এই বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছেন, দেশের এই স্থলবন্দরকে ঘিরে নানামুখী মাস্টার প্লান হাতে নিয়েছে সরকার।

বেনাপোল কাস্টম সূত্রে জানা গেছে, শুধু যশোরের অর্থনীতিই নয়’ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উৎস বেনাপোল স্থলবন্দর। ভারত-বাংলাদেশের সিংহভাগ বাণিজ্য এ বন্দর দিয়ে হয়। প্রতিবছর বন্দর থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায় সরকার। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে যেমন বন্দরটি বড় ভূমিকা পালন করছে তেমনি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হচ্ছে। আমদানি-রফতানির সবচেয়ে বড় রুট বেনাপোল। বছরে ভারতে ৪০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি ও আট হাজার কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়। বেনাপোল বন্দরের কারণে বদলে গেছে যশোর অঞ্চলের মানুষের জীবন। হয়েছে অবকাঠামোর উন্নয়ন। এমন পরিস্থিতিতে পদ্মাসেতু চালু হলে বেনাপোল বন্দরে আমদানি রপ্তানি বেড়ে হবে দ্বিগুণ। এই অঞ্চলে বাড়বে শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ। গতি পাবে নগরায়ণ। বাড়বে কর্মসংস্থান।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার আজিজুর রহমান জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য আমদানি করা হয়েছে ২০ লাখ ১১ হাজার ৬ মেট্রিক টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৬৪ মেট্রিক টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬০৬ মেট্রিক টন। আমদানি ও রফতানি থেকে বন্দর ও কাস্টমস রাজস্ব আদায় করে কমপক্ষে ৮ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে এটা খুবই আনন্দের বিষয়। বেনাপোল দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়বে দ্বিগুণ। বেনাপোল দিয়ে রেলপথে মালামাল আমদানি বেড়েছে। পদ্মা সেতু দিয়ে পণ্য খালাসের পর দ্রুত সময়ে রেলযোগে পণ্য পৌঁছে যাবে ব্যবসায়ীদের কাছে। আরও গতি বাড়বে বেনাপোল বন্দরে। ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়ে দ্বিগুণ হবে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামছুর রহমান বলেন, আর কয়েক দিন পর উদ্বোধন হবে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে গতি আসবে বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানিতে। ঘটবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। বেনাপোল থেকে পণ্যবোঝাই ট্রাক রাজধানীতে পৌঁছাতে পারবে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে। যেতে পারবে দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায়। এতে একদিকে যেমন পরিবহন খরচ কমবে, অন্যদিকে বাজারে কমে আসবে বিভিন্ন পণ্যের দামও। বেনাপোল আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মহসিন মিলন জানান, বেনাপোল বন্দর ব্যবহারকারীদের চাওয়া পদ্মা বহুমুখী সেতু চালুর মধ্য দিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ এবং কম সময় লাগায় দেশে অন্যতম বেনাপোল বন্দর ব্যবহারে আমদানি ও রফতানিকারকরা উৎসাহিত হবে। আমদানি ও রফতানিকারকদের অর্থ সাশ্রয় হবে। বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ লতা জানান, পদ্মা সেতু ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির ভূমিকা রাখার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। দেশ থেকে রফতানি দ্বিগুণ বাড়বে। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, সকল দিকেই পদ্মা সেতুর প্রভাব পড়বে। বেনাপোল বন্দর তার গৌরব ফিরে পাবে বলে প্রত্যাশাও করেন তিনি।

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ডাইরেক্টর মতিয়ার রহমান বলেন, ঢাকা ছিল এই অঞ্চলের মানুষের জন্য দুর্গম পথ। বেনাপোল থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লেগে যেত। শীতের মৌসুমে ঘন কুয়াশার কারণে পদ্মার দু’পাড়ে শত শত যানবাহন এবং হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ দেখেছি। এ অঞ্চলের মেধাবীরা উন্নত সড়ক যোগাযোগ না থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় গিয়ে পড়াশুনা করতে পারেনি। সময়মতো পদ্মা পার হতে না পেরে ফেরি ঘাটেই অনেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে সে অবস্থার অবসান ঘটবে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের যুগ্ম কমিশনার আব্দুর রশিদ মিয়া জানান, পদ্মা সেতু ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন। সেতুটি নির্মাণ করায় এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য খুলে যাবে। বেনাপোল বন্দর দিয়ে দ্রুত ও কম খরচে পণ্য খালাস করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে যাত্রী পারাপার বাড়বে। বর্তমানে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজার যাত্রী ভারতে যাতায়াত করছে। পদ্মা সেতু চালু হলে যাত্রী পারাপার বাড়বে, একইসঙ্গে বাড়বে সরকারের রাজস্ব আয়।

শেয়ার