সুজলপুরে অমানুষিক নির্যাতনে যুবকের মৃত্যু জড়িতদের শাস্তি দাবিতে লাশ নিয়ে বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোর শহরতলীর সুজলপুরে প্রতিপক্ষের অমানুষিক নির্যাতনে আহত ইরিয়ান গাজী (২৩) মারা গেছেন। গত শনিবার রাত ১১টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইরিয়ান মারা গেছেন বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন। ইরিয়ান গাজী সুজলপুর এক নম্বর পাড়ার খোরশেদ আলীর ছেলে।

গত ২০ মে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সুজলপুর বাজারে জাকারিয়ার চায়ের দোকানের সামনে একই এলাকার আতিয়ার রহমানের ছেলে সাকিব (২৫) ও তার বন্ধু নাহিদের সাথে ইরিয়ানের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মারামারি হয়। এই ঘটনার পর সাকিব ও নাহিদ পক্ষীয়রা তাকে মারপিট করে। ইরিয়ান পালিয়ে শহরতলীর কৃষ্ণবাটি গ্রামে বোনের বাড়িতে পালিয়ে গেলে সেখানে গিয়েও তাকে মারপিট এবং ছুরিকাঘাতে জখম করে পালিয়ে যায়।

এদিকে ইরিয়ান হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে হাফিজুর রহমান নামে একজনের আটকের সংবাদ পাওয়া গেলেও পুলিশের পক্ষ থেকে কোন আটকের তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি।

ইরিয়ান গাজীর প্রতিবেশিরা জানান, শনিবার দুপুরে ইরিয়ান গাজী ধানের ভ্যান নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এসময় সাকিবের মোটরসাইকেলের সাথে ইরিয়ানের ভ্যানের ধাক্কা লাগে। এতে সাকিব ক্ষিপ্ত হয়ে ইরিয়ানকে মারপিট করে। এরপর ইরিয়ান বাড়ি থেকে চাকু নিয়ে গিয়ে সাকিবকে মারপিট করে। এ ঘটনার পর ইরিয়ানকে মারতে সাকিব তার দলবল নিয়ে চড়াও হয়। ভয়ে ইরিয়ান তার ভাই নসুয়া গাজীকে নিয়ে পাশর্^বর্তী গ্রাম কৃষ্ণবাটিতে বোনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সাকিব ও তার লোকজন সংবাদ পেয়ে ইরিয়ানকে খুজতে অস্ত্র নিয়ে ওই বাড়িতে যায়। ইরিয়ানকে পেয়ে তারা বেধড়ক মারপিট করে। এছাড়া বিদ্যুৎ শক দিয়ে আহত করে। এরপর তাকে ধরে বাড়ির বাইরে নিয়ে চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত জখম করে সুজলপুরে নেয়া হয়। সেখানেও আমানুষিক নির্যাতন করা হয়। তার ওপর তার ভাই ও আশেপাশের লোকজন ইরিয়ানকে উদ্ধার করতে গেলে তাদের বাঁধা দেয় হামলাকারীরা। পরে পুলিশ খবর দিয়ে তাকে উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। উদ্ধারের আগে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় ইরিয়ানের। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে রাত ১১টার দিকে ইরিয়ান মারা যায়।

এদিকে এই মারামারির ঘটনায় হামলাকারী সাকিবের মা আরিফা বেগমের দায়ের করা মামলায় ইরিয়ানসহ ৭জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলো, ইরিয়ানের ভাই নচুয়া গাজী (৩৫), ইমরান গাজী (২৬) ও সেলিম গাজী (৪০) এবং মাইনো গাজীর দুই ছেলে মতিয়ার গাজী (৫০) ও ফসিয়ার গাজী (৩৫) এবং মতিয়ার গাজীর ছেলে অপু (২৩)।

এজাহারে সাকিবের মা আরিফা বেগম উল্লেখ করেছেন, আসামিদের সাথে তার ছেলে সাকিবের পূর্ব শত্রুতা ছিলো। সেকারণে তাকে মারপিট ও খুনের ষড়যন্ত্র করে আসছিল আসামিরা। গত ২০ মে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার ছেলে সুজলপুর বাজারের জাকারিয়ার চায়ের দোকানে অবস্থান করছিল। সে সময় আসামিরা এসে তাকে মারপিট করে। লোহার পাইপ, বাঁশের লাঠি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমন করে। এ সময় সাকিবের বন্ধু নাহিদ ঠেকাতে গেলে তাকেও মারপিট করে। তাদের কাছ থেকে সোনার আংটি, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোনসেট ছিনিয়ে নেয়। পরে হত্যার হুমকি দিয়ে চলে যায়। পরে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে এসে দুইজনকে উদ্ধার করে যশোরে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সাকিবের অবস্থা আশংকাজনক বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এলাকাবাসী জানিয়েছে, একটি তুচ্ছ ঘটনায় উভয়ের মধ্যে মারামারি হয় সুজলপুর বাজারে। এরপর সাকিব ও তার লোকজন ইরিয়ানকে তাড়া করে বেড়ায়। ২০ মে রাতেই ইরিয়ানকে কৃষ্ণবাটি গ্রামে খুঁজে বের করে সেখানেই মারপিটে জখম করে সুজলপুরে নেয়া হয়। সুজলপুরে নিয়ে তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। পরে আহত ইরিয়ানকে উদ্ধার করে নেয়ার পর খুলনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মারা যাওয়ার আগে ইরিয়ান মারামারি মামলার আসামি হন।

যশোর কোতোয়ালি থানার এসআই বিমান তরফদার জানিয়েছেন, সাকিবের পক্ষে একই এলাকার গোলাপ, বুদো, মিঠু ও শরীফসহ ২০/২২ জন কৃষ্ণবাটি থেকে ইরিয়ানকে ধরে সুজলপুর মোড়ে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ইরিয়ান পড়ে থাকে। পরে পুলিশ সংবাদ পেয়ে সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে যশোরে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে পরে খুলনায় নেয়া হয়। সেখানে ইরিয়ানের মৃত্যু হয়।

এবিষয়ে যশোর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, ‘ইরিয়ান হত্যার ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। রাতেই মামলা হতে পারে।’ এই ঘটনায় হাফিজুর রহমান নামে কাউকে আটক করা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে, তিনি আটকের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।

এদিকে, অমানুষিক নির্যাতনে আহত ইরিয়ান গাজীর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাবাসী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকালে তারা জড়িতদের দ্রুত আটক ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

শেয়ার