কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড জনপদ

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ শনিবার হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়ে যশোর, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে অনেক গ্রাম। উড়ে গেছে শত শত ঘরের টিনের চালা। উপড়ে গেছে গাছপালা। গাছের ডাল পড়ে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেছে। আহত হয়েছে অনেকে। অনেক স্থানে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঝড়ে আম, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যশোর বিমানবাহিনী নিয়ন্ত্রণাধীন আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শনিবার সকাল ৬ টা ৫ মিনিট থেকে শুরু হওয়া এ ঝড় স্থায়ী ছিল প্রায় ১৫ মিনিট। এসময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ৩২ নটিক্যাল মাইল। এদিন যশোরে বজ্রপাতসহ ১০ মিলিমিটারের বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঝড়ের তাণ্ডবে শত শত গাছপালা ভেঙে রাস্তায় পড়েছে। শত শত হেক্টর জমির আম, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে যশোর সদর ও বাঘারপাড়া উপজেলায়। সদরের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে হৈবতপুর ইউনিয়নের ১২ টি গ্রামে। এই ইউনিয়নের নাটুয়াপাড়া গ্রামের গৃহবধূ তানিয়া বেগম বলেন, ভোরের দিকে হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। এতে অনেক গাছ ভেঙে গেছে। বড় একটি শিশুগাছ ভেঙ্গে পড়ে আমার একটি গরু মারা গেছে। টিনের বাড়ির টিন উড়ে গেছে। এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

একই এলাকার হোসেন উদ্দিন জানান, সকালের কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ ভেঙ্গে ঘরের মধ্যে পড়েছে। মাথায় আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ি। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে এখন কিছুটা সুস্থ। ঝড়ে লিচু ও আম বাগান নষ্ট করে দিয়েছে। লাখ খানিক টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে। চুড়ামনকাটি গ্রামের কবির হোসেন জানান, সকালের ঝড়ে আমার তিনটি ঘরের চালা উড়ে গেছে। এখন মেরামতের কাজ করছি। ঝড়ে আমার খুব ক্ষতি হয়ে গেল।

হৈবতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিকী জানান, সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হৈবতপুর ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের ২৭টি গ্রামের মধ্যে ১২টি গ্রামের চিরচেনা পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে গেছে ঝড়ে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। কিছু লোক আহতও হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যরা। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করছেন।

এদিকে, ভয়াবহ এই ঝড়ে বন্দবিলা ইউনিয়নের পার্বতীপুর, ঘোপদুর্গাপুর, ধর্মগাতী, চন্ডিপুর, পান্তাপাড়া, মথুরাপুর কাজীপাড়া ও মির্জাপুর এবং জহুরপুরের যাদবপুর স্কুলপাড়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে ঘরে থাকা খাদ্যসামগ্রী। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকাংশই খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। এছাড়া ঝড়ে আম গাছের ডাল ভেঙে মথুরাপুর কাজীপাড়া এলাকায় তাসলিমা বেগম (৫২) নামে এক গৃহবধূ গুরুতর আহত হয়েছেন।

পার্বতীপুর এলাকার আব্দুল মজিদ বলেন, ‘ঝড়ে বাতাসের তুমুল বেগ ছিল। ৬ ফুট চওড়া ও ৫০ ফুট লম্বা একটি গাছ আমার ঘরের উপর পড়ে সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে।’ জহুরপুর ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিন্টু জানান, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাদ্য সামগ্রী, টিন ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

বাঘারপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, বোরো ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে। ঝড়ো বাতাসের কারণে পাট ও তিল ক্ষেতের সামান্য ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। পল্লী বিদ্যুৎ খাজুরা সাব- জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার আজাদুল ইসলাম জানান, ঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়া ছাড়াও গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়েছে বিদ্যুতের তারের উপর। গাছপালা অপসারণসহ বিদ্যুতের খুঁটি মেরামতের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে সব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে জানান তিনি।

যশোর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মনোরঞ্জন সরকার জানান, কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের দু’পাশে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে এবং গাছের ডাল পড়ে তার ছিঁড়ে অনেক স্থানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিছু কিছু জায়গায় এলাকাবাসীর সহায়তায় আবার কোথাও কোথাও ফায়ার সার্ভিসের টিম গাছগুলো সড়ক থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক দীপাঙ্কর দাস বলেন, ঝড়ে আম, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাৎক্ষণিক ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা যায়নি। তবে কৃষি বিভাগের লোকজন মাঠে গিয়ে ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে কাজ করছে। যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনুপ দাশ বলেন, শনিবারের হঠাৎ ঝড়ে উপজেলার বেশকিছু জায়গায় ক্ষতি হয়েছে। আমরা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে আছি।

শেয়ার