সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গাছ লাগিয়ে অনন্য নজির পাইকগাছার দিনমজুর নকিম উদ্দীনের

পাইকগাছা প্রতিনিধি ॥ সমাজের প্রতি মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের অনেক দায় বদ্ধতা রয়েছে। ইচ্ছে করলেই প্রতিদিন কিংবা প্রতি মাসে না হলেও প্রতিবছর আমরা কিছু কিছু ভাল কাজ করতে পারি। যেকাজগুলো করার জন্য খুববেশি অর্থের যেমন প্রয়োজন হয় না, আবার কাজগুলো সমাজ, দেশ ও জাতির অনেক কল্যাণ হতে পারে। জনস্বার্থে এমনই কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পাইকগাছার ৮০ বছরের বয়সী দিনমজুর নকিম উদ্দীন জোয়াদ্দার। বৃক্ষপ্রেমিক নকিম উদ্দীন জোয়াদ্দার উপজেলার বান্দিকাটী গ্রামের মৃত কামাল উদ্দীন জোয়াদ্দারের ছেলে।

দিনমজুরের টাকায় যেখানে সংসার চালানোই কঠিন; সেখানে তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে অদ্যাবধি প্রতিবছর এলাকার কোন না কোন প্রতিষ্ঠানে গাছ লাগান। প্রথমে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাছ লাগান। এরপর তিনি উপজেলা পরিষদ, আদালত, থানা, ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজ, সিনিয়র মাদরাসা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং সড়কসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফলদ, বনজ ও ঔষধী গাছ লাগিয়েছেন। এভাবেই তিনি বিগত ২৪ বছর এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হাজারো গাছ লাগিয়ে মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তার লাগানো গাছ এখন সরকারের কোটি টাকার সম্পদে পরিণত হয়েছে।

ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নুপুর মন্ডল জানান, ক্যাম্পাসে লাগানো গাছের ফল আমরা শিক্ষার্থীরা সবাই অনেক মজা করে খেয়েছি। কিন্তু এই গাছগুলো যে একজন দিনমজুর লাগিয়েছেন জানতে পেরে তাকে নিয়ে গর্ব হয়। তার প্রতি রইল সম্মান ও শ্রদ্ধা।

ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক সেখ রুহুল কুদ্দুস জানান, আমি যখন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলাম ওই সময় নকিম উদ্দীন আমাদের কলেজে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছিলেন। যে গাছগুলো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক গাছেই ফল হয়, যে ফল আমরা শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা সবাই মিলে খাই। এটি একটি মহৎ কাজ। এ গাছগুলো যতদিন বেঁচে থাকবে নকিম উদ্দীনও ততদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম জানান, শুধু নকিম উদ্দীন নয়, সমাজে আমরা যে যেখানে অবস্থান করছি সমাজের প্রতি আমাদের প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা রয়েছে। ভাল কাজ করার জন্য খুব বেশি অর্থ সম্পদের প্রয়োজন যে হয় না সেটা দিনমজুর নকিম উদ্দীন দেখিয়ে দিয়েছেন। নকিম উদ্দীন যে একজন মহৎ ব্যক্তি এতে কোন সন্দেহ নাই। ইচ্ছে করলেই আমরা নকিম উদ্দীনের ন্যায় প্রতিদিন কিছু না কিছু ভাল কাজ করতে পারি। প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহ, মাস কিংবা বছরে অন্তত কিছু ভাল কাজ করা আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ। নকিম উদ্দীনকে অনুসরণ করে সমাজ, দেশ এবং মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসার জন্য এলাকার সকলের প্রতি আহ্বান জানান উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী এ কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে নকিম উদ্দীন জানান, গাছ লাগানোর ব্যাপারে আমার বাবা আমাকে উৎসাহিত করতেন। মানুষের মতো গাছও সমাজের অনেক উপকারে আসে। গাছ আমাদের ছায়া দেয়, ফল দেয় এবং পরিবেশ ভাল রাখে। এসব ভেবেই আমি নিজ উদ্যোগে জনস্বার্থে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেই। এ পর্যন্ত আমি উপজেলা পরিষদ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজ, আদালত চত্বর, থানা চত্বর, সিনিয়র মাদরাসা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং আমার বাড়ির পাশে চেঁচুয়া মসজিদ হতে জহর চৌকিদারের বাড়ি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ফলদ, বনজ ও ঔষধী গাছ লাগিয়েছি। আমি শুধু এলাকা নয় এলাকার বাইরে সুন্দরবনের হিরোন পয়েন্টেও গাছ লাগিয়েছি। আমি যেসব গাছ লাগিয়েছি সেগুলো প্রতিবছর কমবেশি পরিচর্যাও করি। গাছগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানে গাছ লাগিয়েছি সেখানে গিয়ে গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরে আদর করি। গাছগুলোসব আমার সন্তানের মতো। নিজের সন্তান কতোটা মানুষ করতে পেরেছি জানিনা, তবে সন্তান সমতুল্য গাছগুলোকে বড় করতে পেরে নিজেকে অনেক ভাল লাগে। এখনো প্রতি বছর এভাবেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গাছ লাগানো অব্যাহত রেখেছেন বলে জানিয়েছেন বৃক্ষপ্রেমিক দিনমজুর নকিম উদ্দীন জোয়াদ্দার।

শেয়ার