বাঁহাতি স্পিনারের দেশে ধাঁধার নাম বাঁহাতি স্পিন

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ‘আতঙ্ক’ শব্দটায় রাসেল ডমিঙ্গো আপত্তি করবেন নিশ্চিত। দুর্ভাবনা কিংবা দুশ্চিন্তার কোনো জায়গাই তিনি দেখছেন না। তবে বালিতে মুখ গুঁজে থেকে তো আর ঝড় এড়ানো যায় না। বাস্তবতাও তাই স্পষ্ট। কেশভ মহারাজের ধ্বংসযজ্ঞের পর মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশের ব্যাটিং। কিন্তু উঁকি দিলেই দেখা যাচ্ছে নতুন শঙ্কার চোখ রাঙানি। এই সিরিজের দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে আছেন প্রাভিন জয়াবিক্রমা ও লাসিথ এম্বুলদেনিয়া।

দুজনের কেউ বিশ্ব ক্রিকেটের বড় নাম নয়। সাদা চোখে ভয়ঙ্কর কোনো স্পিনারও তারা কেউ নন। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে এই দুই বাঁহাতি স্পিনারই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য বিপদের কারণ।

বরাবরই বাংলাদেশ পরিচিত বাঁহাতি স্পিনাদের দেশ হিসেবে। গাদা গাদা বাঁহাতি স্পিনার বেরিয়ে আসে এখান থেকে। এখনও ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতি দলেই বাঁহাতি স্পিনারের আধিক্য। জাতীয় দলের প্রতিটি ব্যাটসম্যান কৈশোর থেকেই বাঁহাতি স্পিনারদের খেলেই বেড়ে ওঠে। অথচ বাঁহাতি স্পিন বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠেছে যেন আতঙ্কের প্রতিশব্দ।

সবশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে মহারাজের মহাকীর্তির রেশ তো এখনও পুরোপুরি যায়নি। টানা দুই টেস্টে দলের দ্বিতীয় ইনিংসে প্রোটিয়া বাঁহাতি স্পিনার নেন ৭টি করে উইকেট। তার বোলিংয়ের সামনে একদম অসহায় ছিল বাংলাদেশের ব্যাটিং।

প্রতিপক্ষ যখন এবার শ্রীলঙ্কা, দুই দলের সবশেষ লড়াইয়ের স্মৃতি তো ফিরে আসবেই বারবার। চোটের কারণে সেবার খেলতে পারেননি এম্বুলদেনিয়া। কিন্তু তার জায়গায় সুযোগ পেয়ে আনকোরা জয়াবিক্রমা অভিষেক টেস্টেই বাংলাদেশকে বিধ্বস্ত করে উইকেট নেন ১১টি!

এমনকি জোমেল ওয়ারিক্যানের মতো বাঁহাতি স্পিনার, যিনি মোটেও সুপরিচিত নন বিশ্ব ক্রিকেটে, গত বছর এই ক্যারিবিয়ান স্পিনারও বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই টেস্টে নেন ১০ উইকেট। এই চট্টগ্রামেই নেন ম্যাচে ৭ উইকেট।

এবার এম্বুলদেনিয়া ও জয়াবিক্রমাকে নিয়ে শঙ্কার যথেষ্ট উপকরণ তাই থাকছে বটে। এম্বুলদেনিয়া এর মধ্যেই শ্রীলঙ্কার বড় স্পিন ভরসা হয়ে উঠেছেন। ১৫ টেস্টেই তার শিকার ৭০ উইকেট। দারুণ সম্ভাবনার ঝিলিক দেখিয়ে জয়াবিক্রমা ৪ টেস্টে নিয়েছেন ২৫ উইকেট।

শ্রীলঙ্কার সবশেষ টেস্টে গত মার্চে ভারতের মতো শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপের বিপক্ষে জয়াবিক্রমা নেন ম্যাচে ৭ উইকেট, এম্বুলদেনিয়া ৬টি। এই দুজন ছাড়াও এবার বাংলাদেশ সফরের শ্রীলঙ্কা দলে আছেন কামিন্দু মেন্ডিস, যিনি স্পিন করতে পারেন দুই হাতেই। সুযোগ পেলে এবং প্রয়োজন হলে তিনিও দেখাতে চাইবেন বাঁহাতি স্পিনের কসরত।

ডমিঙ্গো অবশ্য দেশের মাঠে বাঁহাতি স্পিন সামলানোয় সমস্যার কিছু দেখেন না। চট্টগ্রামে শুক্রবার দলের অনুশীলনের আগে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের কোচ বললেন, দেশের বাইরে উইকেটের বাউন্সেই মূলত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে স্পিন সামলানোয়।

“একটা কারণ হতে পারে (বাঁহাতি স্পিনে ব্যর্থতার), এখানকার উইকেট খুব বেশি বাউন্স করে না। বাঁহাতি স্পিনে ব্যাটসম্যানদের ভোগান্তি হয় না, সমস্যা হয় দেশের বাইরের ওই বাড়তি বাউন্সে। বাংলাদেশে স্পিনাদের বল অনেক নিচু হয়, এলবিডবি¬উ ও বোল্ড বেশি হয়। বিদেশে বল টার্ন ও বাউন্স করে, ব্যাট-প্যাড ক্যাচ বেশি হয়, ¯ি¬পে ধরা পড়তে হয়। এটিই পার্থক্য, তারা যতটা বাউন্সে অভ্যস্ত, এর চেয়ে বেশি বাউন্সের ওপর চড়ে বসে খেলা।”
জাতীয় নির্বাচক আব্দুর রাজ্জাক অবশ্য এখানে টেকনিক্যাল ও স্কিলের ঘাটতির চেয়ে বেশি দেখছেন মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারটিই। তিনি নিজে ছিলেন বাঁহাতি স্পিনার। লাল বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের সফলতম বোলার তিনি, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৬০০ উইকেট নেওয়া একমাত্র বোলারও। বাঁহাতি স্পিনের ভেতর-বাহির তাই যথেষ্টই ভালো বোঝার কথা তার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, মহারাজ-জয়াবিক্রমাদের খুব বড় হুমকি মনে না করার কারণেই তারা চমকে দিয়েছেন।

“আমার মনে হয়, ওদের নিয়ে একটা প্রত্যাশা ছিল না। মানে, ওরা এরকম করতে পারে, এতটা হয়তো আমরা ভাবিনি। দলের সবার বেশি মনোযোগ ছিল হয়তো অন্য কিছু নিয়ে বা অন্য বোলারদের নিয়ে, সেখানে ওরা ভালো বোলিং করে উল্টো দিক থেকে আক্রমণ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো জায়গায় গিয়ে কারও মানসিকভাবে প্রস্তুতি থাকার কথা নয় এরকম বাঁহাতি স্পিনের জন্য।”

“আমার মন হয়, এরকমই হয়েছে। কারণ এই স্পিনারদের দেখেন, ওরা নিঃসন্দেহে ভালো বোলার। তবে বিধ্বংসী তো নয়। এতটা অসাধারণ আগে আর করেনি। এজন্যই আমরা হয়তো ওদের কথা এত ভাবিনি, যেটা আমাদের জন্য কাল হয়ে গেছে।”

রাজ্জাকের ধারণা, এবারের সিরিজে এম্বুলদেনিয়া-জয়াবিক্রমাদের ভালোভাবেই সামলাতে পারবে বাংলাদেশ দল।

“সামলাতে না পারার কারণ নেই। যেটা বললাম, তারা ভালো। কিন্তু গ্রেট স্পিনার তো নয়। বাংলাদেশ স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারলেই ওরা সফল হবে না।”

সেই সামলানোর পথও দেখিয়ে দিলেন রাসেল ডমিঙ্গো। বাংলাদেশ কোচের মতে, এক-দুই রান করে নিয়ে বাঁহাতি স্পিনারদের লেংথ এলোমেলো করে দিতে হবে এবং ছন্দ পেতে দেওয়া যাবে না।

“না না, দুর্ভাবনার কোনো অবকাশ নেই (বাঁহাতি স্পিন নিয়ে)। পুরো ব্যাপারটি হলো খেলার পরিকল্পনায় অটল থাকা। গুরুত্বপূর্ণ হলো স্ট্রাইক নিয়ে প্রান্ত বদলানো।”

“আমরা হয়তো ব¬ক করতে করতে বাউন্ডারি বলের অপেক্ষা একটু বেশিই করি। সিঙ্গেল তাই আরেকটু বেশি নিতে হবে এবং অন্য প্রান্তে যেত হবে যতটা সম্ভব। সেটা প্যাডল শট খেলে হোক বা পায়ের ব্যবহার করে কিংবা ক্রিজের গভীরে গিয়ে, একেক ব্যাটসম্যানের জন্য একেকরকম। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রান্ত বদলানো এবং সিঙ্গেল নেওয়ার পথ বের করা।”

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা এই কাজ কতটা করতে পারবে, সেটির ওপরই হয়তো নির্ভর করবে সিরিজে দলের সাফল্য-ব্যর্থতা।

শেয়ার