বৈরী আবহাওয়ায়ও চলছে বোরো ধান কাটা ও মাড়াই
বাম্পার ফলন ঘরে তোলার সংগ্রাম

 ২৭ টাকা দরে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ২০,৭২৮ মে.টন
 চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ২৬,৭৫৪ মে. টন, দর ৪০ টাকা

বৈরী আবহাওয়ায়ও চলছে বোরো ধান কাটা ও মাড়াই বাম্পার ফলন ঘরে তোলার সংগ্রাম
ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে যশোর অঞ্চলে কয়েকদিন ধরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বোরো মৌসুমে সোনালি ধান কাটার মাঝেই অশনির প্রভাবে বৃষ্টি। ফলে মাঠে কেটে রাখা ধান এখন কৃষকের গলার ফাঁস। গতকাল যশোর সদরের বেলতলা মাঠে পানি থেকে কেটে রাখা ধান রক্ষা করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা

প্রণব দাস: গ্রামবাংলায় দিগন্ত জোড়া মাঠে এখন চলছে বোরো ধান কাটাও মাড়াইয়ের ভরা মৌসুম। কিন্তু এ মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে আবহাওয়া প্রতিকূল। ঝড়োহাওয়ার পাশাপাশি থেকে থেকেই ঝরছে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ফলে নিম্নাঞ্চলের জমির পাকা ধান হেলে পড়েছে মাঠে। আবার অনেক মাঠে জমে থাকা বৃষ্টির পানির উপর ভাসছে কাটা ধান। এতে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। তারপরও বাম্পার বোরো ফলনের আশা করছেন তারা।

কৃষকেরা জানান, বৃষ্টির ফলে দ্রুত ধান উঠানে তুলতে না পারলে ক্ষেতের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কৃষাণ-কৃষাণিরা তাদের ঘরে সোনালী এ ধান কাটা ও মাড়াই করতে পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়েছেন।
এদিকে যশোরের প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ২৭ টাকা কেজি দরে বোরো মৌসুমের ২০ হাজার ৭২৮ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহ করবে সরকার। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এ সংগ্রহ কার্যক্রম। ৫টি উপজেলায় (সদর, কেশবপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা) অ্যাপসের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হবে। বাকি তিন উপজেলায় (বাঘারপাড়া, অভয়নগর ও মণিরামপুর) নিবন্ধিতদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হবে।

এছাড়া যশোর জেলার চুক্তিযোগ্য ২৫৭ টি (অটোমেটিক মিল ২৩ ও হাস্কিং মিল ২৩৪) রাইস মিল মালিকদের কাছ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বোরো মৌসুমের ২৬ হাজার ৭৫৪ মেট্রিকটন চাল সংগ্রহ করবে সরকার। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এ সংগ্রহ কার্যক্রম।

এছাড়া শার্শা, অভয়নগর, ঝিকরগাছা, মণিরামপুর ও চৌগাছা উপজেলার কৃষকদের কাছ থেকে প্রতিকেজি ২৮ টাকা দরে মোট ১৯৫ মেট্রিকটন গম সংগ্রহ করবে সরকার। ৩০ জুন পর্যন্ত চলবে এ গম সংগ্রহ কার্যক্রম।
বুধবার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জেলা ধান সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটির সভায় এতথ্য জানানো হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান। তিনি জানান, অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা, ২০১৭ অনুযায়ী এ ধান, চাল ও গম সংগ্রহ নিশ্চিত করা হবে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রফিকুল হাসান, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) নিত্যানন্দ কুণ্ডু, বিএডিসি যশোরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. খোরশেদ আলম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা অঞ্জনা রাণী ঘোষ ও কৃষক প্রতিনিধি অ্যাড. সামছুর রহমান।

সভায় জানানো হয়, মন্ত্রণালয় থেকে যশোরের আট উপজেলায় সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা তিন হাজার ১৩৮ মেট্রিকটন, চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছয় হাজার ২৬৫ মেট্রিকটন। শার্শা উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা তিন হাজার ৩২৫ মেট্রিকটন, চাল ছয় হাজার ২৬৫ মেট্রিকটন ও গম ৪০ মেট্রিক টন। অভয়নগর উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা এক হাজার ৮৫২ মেট্রিকটন, চাল সাত হাজার ১১২ মেট্রিকটন ও গম ২৫ মেট্রিক টন। ঝিকরগাছা উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার ৭১৫ মেট্রিকটন, চাল এক হাজার ৬০৮ মেট্রিকটন ও গম ২৬ মেট্রিকটন। কেশবপুর উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা এক হাজার ৩৬০ মেট্রিকটন, চাল এক হাজার ১৬ মেট্রিকটন। বাঘারপাড়া উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা এক হাজার ৯৭৫ মেট্রিকটন, চাল ৩২৬ মেট্রিকটন। মণিরামপুর উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা তিন হাজার ৮৯২ মেট্রিকটন, চাল দুই হাজার ৫২৫ মেট্রিকটন ও গম ৩৫ মেট্রিকটন এবং চৌগাছা উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার ৪৭১ মেট্রিকটন, চাল এক হাজার ৬৩১ মেট্রিকটন ও গম ৬৯ মেট্রিকটন।

এদিকে কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খাদ্যশস্যে উদ্বৃত্ত যশোর জেলায় গত মওসুমের তুলনায় চলতি মৌসুমে বোরো চাষাবাদ বেড়েছে। জেলার আটটি উপজেলায় এক লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে এক লাখ ৫৮ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে।
যার মধ্যে উফশী জাতের আবাদ করা হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৬২০ হেক্টর ও হাইব্রিড জাতের আবাদ হয়েছে ২৬ হাজার ৮৮০ হেক্টর।

সদর উপজেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ২৭ হাজার ২৬০ হেক্টর, শার্শা উপজেলায় আবাদ হয়েছে ২৩ হাজার ৬৬০ হেক্টর, ঝিকরগাছায় আবাদ হয়েছে ১৮ হাজার ৮৫০ হেক্টরে, চৌগাছায় আবাদ হয়েছে ১৮ হাজার ৬৩০ হেক্টর, অভয়নগরে আবাদ করা হয়েছে ১২ হাজার ২০০ হেক্টর, বাঘারপাড়ায় আবাদ হয়েছে ১৬ হাজার ৪২০ হেক্টর, মণিরামপুরে আবাদ হয়েছে ২৬ হাজার ৯৬৫ হেক্টর এবং কেশবপুর উপজেলায় বোরা ধানের আবাদ হয়েছে ১৪ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে।

এদিকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ কম হলেও যশোর অঞ্চলের বোরোর ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। এমনই সুখবর জানাচ্ছেন যশোর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আধিকারিকগণ।

এদিকে সচ্ছলতার হাসি নিয়ে কৃষাণ-কৃষাণির দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে মাঠের সোনালী ফসল ঘরে আসতে শুরু করেছে। ফলন ভালো হওয়ায় তাদের আঙিনা ভরে উঠছে সোনালী শস্যে; মুখে ফুটেছে হাসির ঝিলিক। ফসলের মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠছে সারা বাড়ি। উঠোনে ছড়ানো সোনালী ধান। তাই কন্যা-জায়া-জননীর ব্যস্ততা এখন দিনরাত। তবে ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায় চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা।

মণিরামপুর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের নাদড়া গ্রামের কৃষক গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, এবছর ফসল ভালো হয়েছে; তবে ফসল ঘরে তোলার আগেই অঝোর ধারার বৃষ্টিতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি দেশি জিরা মিনিকেট ধান লাগিয়েছেন। তার ৫ বিঘা জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে তার এলাকার অনেকেরই ধান কাটা হয়নি বলে জানান তিনি। অকাল বর্ষণে মাঠের ধানগাছ লুটিয়ে পড়ায় কাটতে অসুবিধা হচ্ছে বলে তিনি জানান। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে সব ধান চাষিদের ঘরে চলে আসবে বলে তিনি জানান।

যশোর সদর উপজেলার বড় হৈবতপুর গ্রামের কৃষিজীবী প্রতাপ তরফদার জানান, মাঠে ধান পেকে গেলেও বৃষ্টির জন্য তা কাটা হয়নি। তিনি বিআর ২৮ জাতের ধান চাষ করেছিলেন। কাঠা প্রতি মণের বেশি ধান উৎপাদন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বাজারে ধানের দামও ভালো বলে তিনি জানান।

শেয়ার