আইডিয়ার ব্যতিক্রমী ঈদ বাজার
৩শ’ টাকা কেজি গরুর মাংস, ৫০ টাকা কেজি পোলাও চাল ও চিনি!

12
৩শ’ টাকা কেজি গরুর মাংস, ৫০ টাকা কেজি পোলাও চাল ও চিনি!

৩শ’ টাকা কেজি গরুর মাংস, ৫০ টাকা কেজি পোলাও চাল ও চিনি!নিজস্ব প্রতিবেদক॥ ৩শ’ টাকা কেজি গরুর মাংস, ৫০ টাকা কেজি পোলাও চাল আর ৫০ টাকায় চিনি! এইসব পণ্য কিনলে উপহার হিসেবে আরও মিলছে সেমাই, মসলা! এযেন শায়েস্তা খাঁ’র আমলের বাজার! এমনই বাজার খুলেছিল যশোরের আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা। ‘মধ্যবিত্তের ঈদ বাজার’ নাম দিয়ে এভাবেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের পাশে দাঁড়িয়েছে আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা।

রমজানের একমাস সফলভাবে ‘লস প্রজেক্ট’ শেষ করার পর ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে স্থাপন করা হলো এবাজার। মঙ্গলবার যশোর শহরের খড়কি এলাকায় আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা চত্বরে বসেছিল ব্যতিক্রমী এই ‘মধ্যবিত্তের ঈদ বাজার’। রমজানে অর্ধেক মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা ৪৭২টি পরিবার এই ঈদের বাজার করেছে।

আয়োজকরা জানান, মধ্যবিত্তের ঈদ বাজারে দেশি গরুর মাংস প্রতিকেজি ৩শ’ টাকা, পোলাও চাল ৫০ টাকা ও চিনি ৫০ টাকা কেজি দরে প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া এর সাথে সেমাই, মাংসের মসলা, বাদাম, কিসমিস উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছে। ‘আইডিয়া লস্ প্রজেক্টের’ সুফলভোগী ৪৭২টি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে এই পণ্য প্রদান করা হয়।

আইডিয়া থেকে ঈদবাজার করতে আসা খড়কি পীরবাড়ি এলাকার ইজিবাইকচালক জামাল উদ্দিন বলেন, আমরা যারা খেটেখুটে বাজার করে খেতে চাই, তাদের বাজারে যেয়ে গরুর গোশ্ কেনার ক্ষমতা নেই। এখানে সাড়ে ৬শ’ টাকার গরুর গোশ্ ৩শ’ টাকায়, ১২০ টাকার পোলাও চাল ৫০ টাকায় ও ৯০টাকার চিনি ৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। কম টাকায় আমরা আনন্দের সাথে ঈদের দিন গরুর গোশ্ খেতে পারবো।
খড়কি এলাকার একজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, করোনার ধাক্কায় অর্থনৈতিক অবস্থা এতো নিচে নেমে গেছে যে, শেষ কবে গরুর মাংস খেয়েছি মনে পড়ছে না। এই সংগঠনটির কল্যাণে ঈদের দিন সবার মুখে গরুর মাংস তুলে দিতে পারবো।

খড়কি দক্ষিণপাড়া এলাকার ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি আব্দুল আলীম বললেন, ৩শ’ টাকায় গরুর গোশ্, ৫০ টাকায় পোলাও চাল, চিনির পাশাপাশি সেমাই মসলা উপহার হিসেবে দিচ্ছে। ঈদের দিন সবার মুখে গরুর গোশ্ তুলে দিতে পারবো; এতে খুব আনন্দ হচ্ছে।

গাজীর বাজার এলাকার সাজেদা বেগম বিভিন্ন মেসে রান্না করেন। তিনি বললেন, ‘রমজান মাসে কম দামে চাল, তেল, চিড়ে, ছোলা কিনিছি। এখন অর্ধেক দামে গরুর গোস্ত, পোলাও চাল পাচ্ছি। আমি আল্লার কাছে দোয়া করি, এরা যেন আরও বেশি বেশি মানষির জন্যি করতি পারে।’

আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থার প্রধান উপদেষ্টা যশোর সরকারি এমএম কলেজের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন বলেন, পবিত্র রমজানে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির পাশে দাঁড়াতে আইডিয়া লস প্রজেক্ট শুরু করেছিল। সমাজের উচ্চবিত্তরা সবকিছুই কিনতে পারেন। নিম্নবিত্তের মানুষেরা সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন ‘ত্রাণ’ সুবিধার জন্যে মানুষের কাছে হাত পাততে পারলেও চক্ষু লজ্জার খাতিরে ‘মধ্যবিত্ত’ তাদের কান্না লুকিয়েই রাখে। ‘আইডিয়া লস প্রোজেক্ট’ পরোক্ষভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর দাম সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সহনশীলতার মধ্যে নিয়ে আসার একটি প্রকল্প। এই লস্ প্রজেক্টের খবর গণমাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। আইডিয়ার নিজস্ব তহবিল ও সহযোগিতা মিলিয়ে লস্ প্রজেক্টের পর এই ‘মধ্যবিত্তের ঈদ বাজার’ স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে ওই পরিবারগুলো অর্ধেকের কমদামে গরুর মাংস, পোলাও চাল ও চিনি ক্রয় করছেন। আর ক্রেতাদের উপহার হিসেবে সেমাই, মসলা দেয়া হচ্ছে।

সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন আরও বলেন, আইডিয়ার সদস্য শিক্ষার্থীরা প্রজেক্টে ‘লস’ করেছে সমাজের লাভের জন্যে। আর সমাজটা আমাদের সবার। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি- যারা কারো কাছেই হাত পাততে পারে না, আবার কারো অনুদানও গ্রহণ করতে লজ্জাবোধ করেন, তাদেরকে সসম্মানে ক্রয় ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ‘লস’কে সাদকাহ হিসাবে বিবেচনা করেছে। লস্ প্রজেক্ট নিয়ে রমজানে পাশে থাকার পর ওই পরিবারগুলোকে ঈদের আনন্দ দিতে এই ঈদ বাজার স্থাপন করা হয়।

এর আগে ‘মানব কল্যাণে আমরা ঠকতে চাই’ শ্লোগান দিয়ে রমজান মাসকে সামনে রেখে আইডিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে পণ্য বিক্রির মধ্যে দিয়ে এই লস্ প্রজেক্টের যাত্রা শুরু করে। এই প্রজেক্টের আওতায় পুরো রমজান মাসে ৪৭২টি পরিবারের কাছে লোকসানে পণ্য বিক্রি করা হয়। পরিবার প্রতি ৫০ টাকা কেজি দরের চাল ২৫ টাকায় ৫ কেজি, ১৬৮ টাকা লিটারের সয়াবিন তেল ১২০ টাকায়, দেড়শ’ টাকার খেজুর ৮০ টাকায়, ৩৫০ টাকা দরের খেজুর ২০০ টাকায়, ৪০ টাকা দামের ২ কেজি আলু ২০ টাকায়, ৫০ টাকার চিড়া ৩৫ টাকায়, ৮০ টাকা কেজির ছোলা ৫০ টাকায়, ৮০ টাকা কেজি দরের চিনি ৫০ টাকায়, ৯০ টাকা কেজি দরের মসুর ডাল ৬০ টাকায় এবং ৩০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ ১৫ টাকায় প্রদান করা হয়।

অর্থাৎ খেজুর দু’রকম হওয়ায় প্রতি প্যাকেজ ৫৫৫/ ৬৭৫ টাকায় প্রদান করা হয় । স্বাভাবিক বাজার মূল্যে এই প্যাকেজের দাম ছিল ৯৪০/১১৪০ টাকা। গোটা রমজান মাসে প্রতি পরিবার সপ্তাহে একবার করে চার সপ্তাহে মোট চারবার এই পণ্য ক্রয়ের সুযোগ গ্রহণ করে। সবমিলিয়ে আইডিয়া রমজান মাসের এই প্রজেক্টে তিন লক্ষাধিক টাকা ভর্তুকি দিয়ে লস প্রজেক্ট শেষ করে।

আইডিয়া’র লস্ প্রজেক্টের কো-অর্ডিনেটর সংস্থার সাবেক সভাপতি হারুণ অর রশিদ জানান, আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত সমাজকল্যাণমূলক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এই প্রোজেক্টের আওতায় শিক্ষার্থীরা পবিত্র রমজান মাসজুড়ে ‘লস’ করার উদ্দেশ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর ব্যবসা করেছে। সহজ কথায়, তারা বেশি দামে জিনিস কিনে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মাঝে কম দামে বিক্রি করেছে।