আজ তবিবর রহমানের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী

1

আজ তবিবর রহমানের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীসাজেদ রহমান: আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তবিবর রহমান সরদার। ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় একটি রিপোর্টে তবিবর রহমান সরদারের নাম পাওয়া যায়। ওই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘বরিশাল, ফরিদপুরে পাক সৈন্য বেশি নেই, চৌগাছা মুক্ত’। রিপোর্টে বলা হয়..‘‘গত ২৫ নভেম্বর যশোহর জেলার সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাজার চৌগাছা মুক্তি বাহিনী দখল করেছে। ওই অঞ্চলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে বলে মুজিবনগর থেকে আজ জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা ওবায়দুর রহমান। রিপোর্টে আরও বলা হয়..‘‘চৌগাছা মুক্তি বাহিনীর দখলে আসার পর ধীরে ধীরে মানুষ আবার ওই অঞ্চলে ফিরে আসছে। ওই অঞ্চলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য চৌগাছার এমপিএ জনাব তবিবর রহমান সরদারের উপর ভার দেওয়া হয়েছে।’’

অনেক বড় রিপোর্টের এইটুকু অংশ বললাম এই কারণে যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তবিবর রহমান সরদার ছিলেন একজন অন্যতম সংগঠন। ইতিহাসে তা প্রমাণিত। ওই রিপোর্টে তাঁর প্রমাণ জ¦লজ¦ল করছে। আপদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক তবিবর রহমান সরদার ছিলেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য। আজ ৩ এপ্রিল তাঁর ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১০ সালের আজকের দিনে তিনি মারা যান। রাজনৈতিক একাগ্রতা আর নিষ্ঠার কারণে ইউপি সদস্য থেকে শুরু করে একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তবিবর রহমান সরদার। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে, শিক্ষা বিস্তারে তিনি শার্শায় গড়েছেন বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তবিবর রহমান সরদার ১৯৩২ সালের ১ মে শার্শার বারিপোতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকে জড়িয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। ৫২এর ভাষা আন্দোলনে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের শার্শা থানার আহ্বায়ক এবং মহকুমা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছর থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। পরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ২০০২ সাল পর্যন্ত।

তিনি ১৯৫৮ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন ও ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটিং, তাদের দেখভাল, শরণার্থী শিবিরে খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের বিশিষ্ট এই সংগঠক ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে যশোর টাউন হল ময়দানে ঐতিহাসিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে তবিবর রহমান সরদার ১৯৭৩, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি তার জীবনকালে শার্শা এলাকায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ কলেজ, শেখ ফজিলাতুননেছা মহিলা কলেজ, নাভারণ ডিগ্রি কলেজ, বুরুজ বাগান গালর্স হাইস্কুল ও ধলদা তবিবর রহমান সরদার (টিআরএস) মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি।

নাভারনে শেখ ফজিলাতুননেছা মহিলা কলেজ তিনি প্রতিষ্ঠা করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনের তারিখ দিলেন ১৯৯৭ সালের ১৭ নভেম্বর। তবিবর রহমান সরদার ছিলেন পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের মানুষ। তাঁর প্রতিটি কাজ ছিল গোছালো। তিনি মনে করলেন, কলেজে ফজিলাতুননেছার একটি ছবি রাখতে হবে। সেই সময় তাঁর ছবি খুঁজে পাওয়া কঠিন। যোগাযোগ করলেন আমার ভাই শামছুর রহমানের সাথে। শামছুর রহমান যোগাযোগ করলেন ঢাকায় বাংলার বাণী পত্রিকার চিত্রগ্রাহকের (নাম মনে করতে পারছি না) সাথে। তাঁর কাছে উদ্দেশ্য জানাতে তিনি বাংলার বাণীর ল্যাব থেকে রিল বের করে ফজিলাতুননেছার একটি ২৫ ইঞ্চি বাই সাড়ে ১৯ ইঞ্চি ছবি প্রিন্ট করে দিলেন পল্টনের ফুজি কালার ল্যাব থেকে। সেই ছবিটি সুন্দর বাঁধাই করে তিনি নিয়ে এলেন নাভারনে। কলেজের রুমে ছবিটির স্থান হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কলেজ উদ্বোধনকালে ওই ছবির সামনে অনেক সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনিও হয়তো ভাবছিলেন, এত সুন্দর ছবি কোথা থেকে পেল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

শার্শায় এবার তাঁর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগ নাভারন ডিগ্রি কলেজে ৩ এপ্রিল বিকালে আলোচনা সভা, দেয়া মাহফিল ও ইফতারির আয়োজন করেছে।