গণটিকায় জনগণের সন্তুষ্টি

 যশোরে নিবন্ধন ছাড়াই মিলছে করোনা টিকা
 প্রথম দিনে নিয়েছেন দুই হাজার ১১৬ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ যশোরে গণটিকা কার্যক্রমে নাগরিকদের ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার শুরু হওয়া কার্যক্রমে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। টিকা নিতে বাদ পড়াদের টিকার আওতায় আনতে এই জেলায় দুই দিনব্যাপী গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়াই টিকা নেওয়া যাচ্ছে। যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে বুধবার সকালে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। সিভিল সার্জন ও যশোর পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় দুই দিনে ১০ হাজার জনকে সিনোফার্মার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে স্বাস্থ্যবিভাগ। তবে উপচে পড়া ভিড় থাকায় দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে কিছুটা ভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলাও হয়েছে। তারপরও ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন তারা। প্রশংসা করেছেন প্রশাসনের এমন উদ্যোগের। আর দাবি জানিয়েছেন, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে টিকা দেয়ার।

তবে প্রথমদিনের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম লোকে টিকা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্যবিভাগ। তারা বলছে, দুই দিনের এই কর্মসূচিতে ১০ হাজার জনকে সিনোফার্মার এই টিকার প্রথম ডোজের আওতায় আনার প্রস্তুতি রয়েছে। তবে তার অতিরিক্ত লোক এলেও দেওয়া হবে।

বুধবার যশোর ঈদগাহ মাঠে সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৩টা পর্যন্ত চলে গণটিকাদান কার্যক্রম। তবে অনেককেই সকাল সাড়ে সাতটা বা তার আগে এসে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এদিন বেলা যত বেড়েছে; করোনা টিকাদানের লাইনও তত বেড়েছে। দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে যশোর ঈদগাহ ময়দানে গিয়ে দেখা গেছে টিকা নিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের লম্বা লাইন। কেউ কেউ অবশ্য দ্বিতীয় ডোজ নিতেও এসেছেন। তবে তাদের বুঝিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পাঁচটি বুথে ৫ জন করে দায়িত্ব পালন করছেন। এদের মধ্যে দু’জন নার্স ও তিনজন করে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত ছিলেন। পুরুষ আর নারীদের আলাদা আলাদা বুথে স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনার টিকা দিচ্ছেন। এর আগে পৌরসভা থেকে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবীরা গ্রহীতার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও নিবন্ধন কার্ড যাচাই বাছাই শেষে বুথে প্রবেশের অনুমতি দিলেই টিকা দেয়া হচ্ছে। তবে টিকা গ্রহীতা থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ বুথ ও স্বাস্থ্যকর্মী না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে মানুষকে। টিকা নিতে আসা লোকজন গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়ানোর কারণে উল্টো বাড়ছে করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি। লাইনে অপেক্ষমান লোকজনের মুখে মাস্ক থাকলেও বেশিরভাগই মুখের থুতনিতে নামিয়ে মাস্ক পরেছেন।

শহরের বেজপাড়া থেকে গণটিকা নিতে আসেন ব্যবসায়ী স্বপন ও তার স্ত্রী মাকসুদা বেগম। তারা জানান, কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই করোনাভাইরাসের টিকা পেয়েছি। টিকার ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে স্বপন বলেন, ‘১০ লোক এক জায়গায় হলে কিছুটা গ্যানজ্যাম হয়! এত সুন্দর পরিবেশে টিকা নিতে পারব, ভাবতে পারিনি। মেহরাজ হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, টিকার জন্য আবেদন করেছিলাম দুই মাস আগে, কিন্তু এখনো মেসেজ আসেনি। তাই রাগ করে করোনার টিকা নেয়া হয়নি। কিন্তু টিকা নেওয়ার জন্য যশোর পৌরসভা থেকে গত দুই দিন ধরে মাইকিং করে বেড়াচ্ছে। তাই ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে টিকা নিয়েছি। এই কার্যক্রম আরো কয়েকদিন বাড়ানো উচিত। সাথে কেন্দ্রও। সালেহা বেগম নামে এক নারী বলেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হাফিয়ে উঠেছিলাম। ঢাকা থেকে ছেলে ফোন করে বলেছে, জীবন বাঁচাতে হলে করোনার টিকা নিয়ে নাও। তাই এসেছি টিকা নিতে। কিন্তু লাইন যেন শেষ হচ্ছে না। টিকা নিয়েই বাড়ি যাবেন বলে জানান এই অর্ধশত বয়সী নারী।

গণটিকা দেওয়ায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবী সালমান হোসেন বলেন, ‘সেই সকাল থেকে আইডি কার্ড পরীক্ষা নিরীক্ষা করছি। খুব ব্যস্ত ভাই। নির্বিঘেœ টিকাদান চলছে। কোনো অভিযোগ নেই। কেউ কেউ দ্বিতীয় ডোজের জন্য ভিড় করছেন। আমরা তাদের বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি।’

যশোর পৌরসভার স্বাস্থ্যকর্মী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, যশোরের বাসিন্দা যারা পূর্বে টিকা নেননি তাদের যে কেউ টিকা নিতে পারবেন। তাদের অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন আবশ্যক নয়। জাতীয় পরিচয়পত্র, চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর কর্তৃক সনদ ও নাগরিক সনদপত্র দেখিয়ে তারা টিকা নিতে পারবেন। গণটিকা কার্যক্রম সহজ করে দেওয়া হয়েছে। যাতে সবাই টিকা গ্রহণ করতে পারে। এই কার্যক্রম আজ বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, করোনার সংক্রমণ রুখতে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিতকরণ এবং শতভাগ ভ্যাকসিনেশনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ নাগরিককে টিকা প্রদানের (প্রথম ডোজ) আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়। গণটিকাদান কার্যক্রমের প্রথম দিনেই ভালো সাড়া মিলেছে। আমাদের প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি আজ শেষ দিনে আরো বেশি লোক টিকা গ্রহণ করবে। আমাদের লক্ষ্য যশোরে শতভাগ মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা। সবাই যেন টিকা নেয়। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টিকা আছে। যারা টিকা নিতে চাইবে সবাইকে টিকা দেওয়া হবে। এই দুই দিনে ১০ হাজার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এর বেশি যারা আসবে সবাইকে টিকা দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, গণটিকা ছাড়াও যশোরের নির্দিষ্ট কেন্দ্রগুলোতেও টিকা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। বুধবার পর্যন্ত যশোরে ৩২ লাখ ২৫ হাজার ৮১৯ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ডোজ ১৯ লাখ ৫১ হাজার ৭৮৫ জন, দ্বিতীয় ডোজ ১২ লাখ ৪৪ হাজার ৮৮০ জন ও তৃতীয় ডোজ নিয়েছেন ২৯ হাজার ১৫৪ জন।

শেয়ার