যশোরে ওমিক্রনের ‘সামাজিক সংক্রমণ’

 নতুন আক্রান্ত ৩৫ জনই জেলার বাসিন্দা
 সংক্রমণ বাড়লেও স্বাস্থ্যবিধিতে উদাসীনতা

জাহিদ হাসান:  যশোরে আরো ৩৫ জনের করোনার নতুন ধরণ ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে। তারা সবাই যশোরের স্থায়ী বাসিন্দা। শনাক্ত হওয়াদের বিদেশ ভ্রমণের কোনো ইতিহাস নেই। বিদেশফেরত কারো সংস্পর্শে আসার কথাও জানা যায়নি। তাদের বয়স ২০ থেকে ৭১ বছরের মধ্যে। রোববার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জিনোম সেন্টারের গবেষক দল এক বিজ্ঞপ্তিতে ওমিক্রনে শনাক্তের বিষয়টি জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে যশোরে ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে বলে জানিয়েছেন যবিপ্রবি জিনোম সেন্টারের গবেষক দলের সদস্যরা। তারা বলছেন, ওমিক্রন খুবই দ্রুত সংক্রমণশীল। এ কারণে যশোর অঞ্চলে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ৩০ শতাংশের অধিক নমুনা পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে। এজন্য সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের পাশাপাশি টিকা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

তবে সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে ওমিক্রন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে মানতে নারাজ জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগের ভাষ্য, ইতোমধ্যে যারা ওমিক্রনে সংক্রমিত হয়েছেন; তাদের সাথে কারা সংস্পর্শে এসেছে তাদের নজরে রেখেছে। স্বাস্থ্য সচেতনতায় উদাসীনতার কারণেই জেলায় দিনকে দিন করোনা সংক্রমণ বেড়েই চলছে। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আজ মঙ্গলবার জেলা করোনা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা ডেকেছে জেলা প্রশাসক। কমিটির মতামত সাপেক্ষে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া স্থানগুলো বিধিনিষেধের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন করোনা কমিটির একটি সূত্র।

যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারের গবেষক দলটি গত ৩১ ডিসেম্বর হতে ১৯ জানুয়ারি সর্বোমোট ৪১ জনের (২৬ জন পুরুষ ও ১৫ জন নারী) নমুনার স্যাঙ্গার সিকুয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে ৩৫ জনের প্রাথমিকভাবে ওমিক্রন শনাক্ত করেছে। বাকিগুলো ডেল্টা ধরণ বলে শনাক্ত করা হয়েছে। গত ১২ জানুয়ারি জিনোম সেন্টারে তিন জনের নমুনার পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে ওমিক্রন শনাক্ত করা হয়। এ নিয়ে যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারে মোট ৩৮ জনের শরীরে ওমিক্রন শনাক্ত করা হলো। যবিপ্রবি সূত্রটি বলছে, প্রতিষ্ঠানটির জিনোম সেন্টারে ৩৮ জনের নমুনার মধ্যে পূর্বেই ৩টি নমুনার পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য (হোল জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করা হয়েছিল। বাকি ৩৫ জনের স্পাইক প্রোটিনের স্যাঙ্গার সিকুয়েন্সিং-এর মাধ্যমে ১২ থেকে ১৩টি মিউটেশনের উপর ভিত্তি করে ওমিক্রন শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বয়স ২০ থেকে ৭১ বছরের মধ্যে। সংক্রমিত ব্যক্তিদের ঠাণ্ডা, গলাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, হালকা জ্বর ছাড়া অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ নেই। তারা সবাই সুস্থ রয়েছেন।

এই বিষয়ে যবিপ্রবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও জিনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক ইকবাল কবীর জাহিদ সমাজের কথাকে বলেন, যশোর অঞ্চলে ওমিক্রন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ৩০ শতাংশের অধিক নমুনা পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে। জিনোম সেন্টারে ৩৮ জনের নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সে ৩৫ জনের ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে। এটি নমুনা পরীক্ষার তুলনায় সংক্রমণ অনেক বেশি। ফলে যশোরে করোনার নতুন ধরণ ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। আমরা যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারে যাদের শরীরে ওমিক্রন শনাক্ত করেছি তারা সবাই যশোরের বাসিন্দা। শনাক্তদের বিদেশ ভ্রমণের কোনো ইতিহাস নেই। বিদেশফেরত কারো সংস্পর্শে আসার কথাও জানা যায়নি। ফলে আমরা ধরে নিচ্ছি, ওমিক্রন ধরনের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন যশোরে শুরু হয়ে গেছে। করোনার ডেল্টা ধরনের চেয়ে ওমিক্রন চারগুণ শক্তিশালী। একইসাথে ওমিক্রন খুবই দ্রুত সংক্রমণশীল। গবেষণায় লক্ষ্য করেছি, যারা করোনার টিকা গ্রহণের পর ওমিক্রনে সংক্রমণ হচ্ছেন তাদের হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে কম। এমনকি তারা অনেক সুস্থ থাকছেন। এজন্য এখনো যারা টিকা গ্রহণ করেননি; তাদের উচিত দ্রুতই করোনার টিকা গ্রহণ করা। আর মাস্ক ব্যবহারসহ কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

এই বিষয়ে যশোর সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, যশোরে করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। করোনার মধ্যে যশোরে ওমিক্রন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তবে জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ করোনার এই নতুন ধরণ ওমিক্রন সামাজিক সংক্রমণ বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে মানতে নারাজ। তবে জেলায় ইতোমধ্যে যারা ওমিক্রনে সংক্রমিত হয়েছে; তাদের সাথে কারা সংস্পর্শে এসেছে তাদের নজরে রেখেছে স্বাস্থ্যবিভাগ। মূলত জনগণের অসচেতনতার কারণেই আমাদের জেলায় সংক্রমণের হার বাড়ছে। এই জেলাতে বহু মানুষের চলাচল। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার মানুষের চলাচল এই জেলার ওপর দিয়ে বেশি। বেনাপোল বন্দর থাকায় প্রতিনিয়ত হাজার হাজার পরিবহন চলাচল করে। ভারত থেকে প্রচুর মানুষ যাতায়াতসহ পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। করোনা প্রতিরোধে আমরা আগের মতোই কাজ করে যাচ্ছি। এবার একটু বেশি সতর্ক রয়েছি।

এদিকে, জ্যামিতিক হারে যশোরে বাড়ছে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জিনোম সেন্টারে রোববার ২৪ ঘণ্টায় ২৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১০৮ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৪০ দশমিক ৬০ শতাংশ। করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকায় প্রথমে মধ্যম ঝুঁকিতে থাকা যশোরকে তিনদিনের মাথায় রেড জোনের তালিকায় রাখা হয়েছে। ঢাকার বাইরে প্রথম জেলা হিসেবে যশোরে শনাক্ত হয়েছে করোনার ভয়ঙ্কর ধরণ ওমিক্রন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাধারণ মানুষকে মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ মাস্কই পরছেন না। যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ মাস্কবিহীন চলাফেরা করছেন। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে না। এজন্য শহরের অধিকাংশ বাণিজ্যিক এলাকায় মানুষের জটলা লেগেই থাকছে। যাদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জনবল সংকটের কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সায়েমুজ্জামান রোববার রাতে জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলে জানিয়েছেন, বর্তমানে এই সময়ে জেলা প্রশাসনের তিনজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট করোনায় আক্রান্ত। কয়েকদিন আগে সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন করোনায় আক্রান্ত হন। তিনি এখনো চিকিৎসাধীন। শনিবার সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান এবং সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মামুনুর রশীদ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এই মুহূর্তে সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মেহরাজ শারবিন কর্মরত রয়েছেন। এই একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।

শেয়ার