ঝিকরগাছা পৌরসভা নির্বাচনে একটি কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত

১৩ কেন্দ্রের ফলাফলে নৌকা এগিয়ে

শাহ জামাল শিশির, ঝিকরগাছা পৌর প্রতিনিধি: দীর্ঘ ২১ বছর পর অনুষ্ঠিত যশোরের ঝিকরগাছা পৌরসভা নির্বাচনে ফের মেয়র নির্বাচিত হতে চলেছেন বর্তমান মেয়র মোস্তফা আনোয়ার পাশা জামাল। গতকাল ভোটগ্রহণ শেষে গণনায় তিনি ১২শ’ ৪৯ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হতে চলেছেন। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খাদেমুল ইনসান দাঁতব্য চিকিৎসালয় কেন্দ্রের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করায় তাকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নির্বাচিত ঘোষণা করা যায়নি। নির্বাচনের তিন দিন আগে কেন্দ্র পরিবর্তন নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিটের কারণে শেষ সময়ে এসে এ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। আর এ জটিলতার গ্যাড়াকলে পড়ে কাউন্সিলর পদে ভোট বেশি পেলেও একরামুল হক খোকনকে ৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিজয়ী বলা যাচ্ছে না। একই অবস্থা সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর জেসমিন সুলতানার ক্ষেত্রেও। ভোটে এগিয়ে থাকলেও বিজয়ী ঘোষণা শুনতে তাকে অপেক্ষা করতে হবে।

উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঝিকরগাছা পৌরসভার নির্বাচনে ১৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রের ফলাফলে বর্তমান মেয়র আলহাজ মোস্তফা আনোয়ার পাশা জামাল নৌকা প্রতীক নিয়ে ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র স্বতন্ত্র প্রার্থী ইমরান হাসান সামাদ নিপুণ কম্পিউটার প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫ হাজার ৭১২ ভোট। ঘোষিত ১৩ কেন্দ্রে মোস্তফা আনোয়ার পাশা জামাল ১২শ’ ১ ভোট বেশি পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।

যশোর জেলা প্রশাসনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, ১৪টি কেন্দ্রের ফলাফলে বর্তমান মেয়র আলহাজ মোস্তফা আনোয়ার পাশা জামাল নৌকা প্রতীক নিয়ে ৭ হাজার ৩৭৫ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী ইমরান হাসান সামাদ নিপুণ কম্পিউটার প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৬ হাজার ১২৬ ভোট। কিন্তু ফলাফল প্রস্তুত করার মুহূর্তে উচ্চ আদালতের নির্দেশে খাদিমুল ইনসান দাঁতব্য চিকিৎসালয় কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে। এ কারণে ফলাফল ঘোষণাও স্থগিত হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ভোটগ্রহণের তিনদিন আগে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্র পরিবর্তন করে খাদিমুল ইনসান দাঁতব্য চিকিৎসালয়কে ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করে। এনিয়ে উচ্চ আদালতে রিটের প্রেক্ষিতে ফলাফল ঘোষণা নিয়ে এই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

ফলাফল প্রসঙ্গে যশোরের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম বলেন, উচ্চ আদালতে রিটের প্রেক্ষিতে ৪ সপ্তাহের স্থগিতাদেশ পেয়েছেন। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকেই কাল ( সোমবার) এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে।

প্রাপ্ত ফলাফল মতে, নৌকা প্রতীকে ৭ হাজার ৩শ’ ৭৫ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হতে চলেছেন বর্তমান মেয়র মোস্তফা আনোয়ার পাশা জামাল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হাসান সামাদ নিপুন কম্পিউটার প্রতীকে ৬ হাজার ১শ’ ২৬ ভোট পেয়েছেন। আর জগ প্রতীকে উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) সেলিমুল হক সালাম ১৯ শ’, আব্দুল্লাহ আল সাঈদ রেলইঞ্জিন প্রতীকে ১ হাজার ১শ’ ৩০ ভোট, আমিনুল কাদির নারকেল গাছ প্রতীকে ১ হাজার ৩৫, ইমতিয়াজ আহমেদ শিপন মোবাইল ফোন প্রতীকে ৬২৪ ভোট ও জাহাঙ্গীর আলম মুকুল ৩৩ ভোট পেয়েছেন।

এদিকে, কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন ১নং ওয়ার্ডে নজরুল ইসলাম, ২নং ওয়ার্ডে আরিফুজ্জামান আরিফ, ৩নং ওয়ার্ডে সাজ্জাতুল জামান রনি, ৪নং ওয়ার্ডে আলীম গাজী, ৬নং ওয়ার্ডে নুরুজ্জামান বাবু, ৭নং ওয়ার্ডে আমিরুল ইসলাম রাজা, ৮নং ওয়ার্ডে তারিকুজ্জামান ও ৯নং ওয়ার্ডে ইউনুস আলী। আর সংরক্ষিত ১,২,৩ ওয়ার্ডে শ্যামলী খাতুন এবং ৭,৮,৯ ওয়ার্ডে নাজমুন নাহার নাজু বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তবে ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকায় ৫নং ওয়ার্ডে একরামুল হক খোকন ও ২,৩,৪ ওয়ার্ডে জেসমিন সুলতানা ভোটে এগিয়ে থাকলেও বিজয়ী ঘোষণা শুনতে নির্বাচন কমিশনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

এদিকে সকাল আটটায় শুরু হওয়া ভোট গ্রহণ বিরতিহীনভাবে চলেছে বিকেল চারটা পর্যন্ত। সীমানা জটিলতার কারণে দ্বিতীয়বারের মতো এ পৌরসভায় নির্বাচন হলো। এবার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হওয়ায় পৌরসভা জুড়েই উৎসবের আমেজ ছিল।

পৌর সভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ষাটোর্ধ সোলায়মান গাজী বিএম হাইস্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন। দীর্ঘদিন পর ভোট দিতে পেরে তিনি ছিলেন খুশি। তিনি জানান, প্রথমে ইভিএমে ভোট দিতে কিছুটা অস্বস্তি লাগছিলো। ভোট দেওয়ার পরে ভালো লাগছে। সাগর হোসেন নামে এক নবীন ভোটার বলেন, তার যখন ৭ বছর বয়স ছিল তখন এই পৌর সভায় সর্বশেষ নির্বাচন হয়। ২০২০ সালে তিনি ভোটার হন। এবারই প্রথমবারের মতো ভোট দিলেন। ভোট দিতে কোন অসুবিধা হয়নি। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার এস এম শাহজাহান সিরাজ বলেন, দীর্ঘদিন পর ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। সকাল থেকেই ভোটাররা সারিতে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে ভোট দিচ্ছে। সকাল থেকেই পুরুষদের চেয়ে নারীদের উপস্থিতি বেশি। তবে, ইভিএমে ভোট গ্রহণে বয়স্কদের কিছুটা দেরি হলেও তরুণদের সমস্যা হয়নি।

কৃষ্ণনগর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার সাজেদা বেগম জানান, আমার বিয়ে যে বার অর্থাৎ ২০০১ সালে ভোট হয়েছিলো। সেবার ভোটার না হওয়ায় ভোট দিতে পারেননি তিনি। দীর্ঘদিন পর এবার ভোট দিতে এসেছি। এত বছর পর ভোট দিতে পেরে আনন্দ লাগছে।

ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল হক জানান, দীর্ঘ বছর পর নির্বাচন হওয়ায় সাধারণ মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। কোথাও কোন বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, নির্বাচনে মেয়র পদে ৬ জন, ৯টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৬৬ জন এবং তিনটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ১৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৪টি ভোটকেন্দ্রের ৮৬টি বুথে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ৯ দশমিক ৪৩ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ঝিকরগাছা পৌরসভার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ২ এপ্রিল। ওই নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন মোস্তফা আনোয়ার পাশা জামাল। সীমানা জটিলতা কাটিয়ে ২১ বছর পরে পুরাতন সীমানায় নির্বাচনের জন্য গত ৩০ নভেম্বর তফসিল

শেয়ার