সাতক্ষীরার নারী ভাটা শ্রমিক খুনে যশোর আদালতে স্বীকারোক্তি

অন্য শ্রমিকদের সাথে সম্পর্কের
জেরে হত্যা করে স্বামী

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরে ভাটা শ্রমিক ফাহিমা বেগম হত্যা মামলায় তার স্বামী জাহাঙ্গীর মোড়লকে আটক করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। শুক্রবার স্ত্রীকে হত্যার দায় স্বীকার করে জাহাঙ্গীর মোড়ল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। আটক জাহাঙ্গীর পুলিশকে জানিয়েছে, ইট ভাটায় কাজ করার সময় তাকে ওষুধের সাথে ঘুমের বড়ি খাইয়ে অন্য শ্রমিকদের সাথে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হতো। নিষেধ করেও সুফল না পেয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়। এর জের ধরে তাকে হত্যা করে লাশ সেফটিক ট্যাংকে ফেলে দেয়। শুক্রবার যশোর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহাদী হাসানের কাছে ১৬৪ ধারা জবানবন্দিতে জাহাঙ্গীর এ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

এদিকে এই ঘটনায় এর আগে নিহতের ভাই শরিফুল ইসলাম শেখ কোতোয়ালি মডেল থানায় বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আটক জাহাঙ্গীর মোড়ল সাতক্ষীরার তালা উপজেলার সাতপাখিয়া গ্রামের দাউদ মোড়লের ছেলে। মামলার বিবরণে জানা গেছে, নিহত ফাহিমা বেগম সাতক্ষীরার তালা উপজেলার চরগ্রামের মৃত আনসার আলী শেখের মেয়ে। ২১ বছর আগে জাহাঙ্গীর মোড়লের সাথে তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের মরিয়ম (১৮) ও মুশফিকা (১১) নামে দুইটি মেয়ের জন্ম হয়। অভাব অনাটনের সংসারে স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই ইট ভাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।

সাতপাখিয়া গ্রামের ইসমাইল সরদারের সাথে তারা গত ১ ডিসেম্বর যশোরের নরেন্দ্রপুরের দফাদার ভাটায় শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে আসেন। বৃষ্টির কারণে কাজ বন্ধ হওয়ায় এক সপ্তাহ পর তারা বাড়িতে ফিরে যান। গত ১৫ ডিসেম্বর তারা ফের যশোরে কাজ করতে আসেন। ওই দিন বিকেলে দুই মেয়ের সাথে ফাহিমার কথা হয়। কিন্তু পরে আর মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে শ্রমিক সরদার ইসমাইলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার বোন ফাহিমা ও ভগ্নিপতি জাহাঙ্গীর ভাটায় আসেনি। বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নিয়ে তাদের কোন সন্ধান করতে না পেরে ১ জানুয়ারি তালা থানায় একটি জিডি করেন নিহতের ভাই শরিফুল ইসলাম।
গত ১৩ জানুয়ারি সকালে যশোরের নরেন্দ্রপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে টয়লেটের সেফটিক ট্যাংক থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের ভাই শরিফুল ইসলাম শেখ সংবাদ শুনে স্থানীয় এক ইউপি মেম্বরকে সাথে নিয়ে যশোরে আসেন এবং বোনের মরদেহ সনাক্ত করেন। তার ধারণা অজ্ঞাতনামা আসামি তার বোন ফাহিমাকে হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ট্যাংকির ভিতরে লুকিয়ে রাখে। উদ্ধারের পর রাতেই পিবিআই ফাহিমার স্বামী জাহাঙ্গীরকে সাতক্ষীরার তালা এলাকা থেকে আটক করে। আটকের পরে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করে। সে কারণে শুক্রবার জাহাঙ্গীরকে যশোর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়। এসময় বিচারক মাহাদী হাসানের এজলাসে স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে জাহাঙ্গীর। এরপরে জাহাঙ্গীরকে জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দিয়েছেন বিচারক।

এদিকে পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জাহাঙ্গীর স্বীকার করেছেন, স্ত্রী ফাহিমা বেগম ও তিনি যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় ইটের ভাটায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ইটের ভাটায় কাজ করার সময় ফাহিমা বেগম তাকে কাশির ওষুধের সাথে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পড়িয়ে রেখে বিভিন্ন লোকের সাথে অবৈধ মেলামেশা করতো। একপর্যায়ে ফাহিমা বেগমের অপরের সাথে অবৈধ মেলামেশা জাহাঙ্গীর মোড়ল নিজ চোখে দেখে ফেলে। স্ত্রী ফাহিমা বেগমকে এই খারাপ কাজ ছেড়ে দিতে বললেও সে কথা শোনেনি। গেল ১৫ ডিসেম্বর তারা যশোরে ইট ভাটার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথে চিনাটোলা বাজার থেকে একটু সামনে বাস নষ্ট হয়ে গেলে তারা ইজিবাইকে করে মণিরামপুর থানার পাশে যায়। মণিরামপুর থানার সামনের ক্লিনিকে ফাহিমা বেগম বাথরুমে যায়। সেখান থেকে বের হয়ে তারা মাছের আড়ৎ পার হয়ে মন্দিরের সামনে থেকে ইজিবাইকে করে নরেন্দ্রপুর মোড়ে এসে নামে। তারপর সেখানে ইজিবাইক বা ভ্যান না পাওয়ায় অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর মোড়ল ও তার স্ত্রী ফাহিমা বেগম পায়ে হেঁটে ইট ভাটার উদ্দেশ্যে রওনা করে এবং চলতি পথে তাদের ব্যক্তিগত ও সাংসারিক বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া চলতে থাকে।

নরেন্দ্রপুর হাই স্কুলের কাছাকাছি আসলে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর মোড়ল তার স্ত্রী ফাহিমা বেগমকে তার স্বভাব-চরিত্র ভালো করতে বলে। তখন ফাহিমা বেগম জাহাঙ্গীর মোড়লের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি বেধে যায় এবং ফাহিমা বেগম জাহাঙ্গীর মোড়লকে রেখে সামনে হাঁটতে থাকে। তখন জাহাঙ্গীর মোড়ল পেছন থেকে রাস্তার পাশে পাওয়া বাঁশ উঠিয়ে ফাহিমা বেগম’র মাথার পেছনে জোরে আঘাত করলে ফাহিমা বেগম উপুড় হয়ে পিচের রাস্তার পাশে পড়ে যায়। ফাহিমা বেগম পড়ে গেলে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর মোড়ল ফাহিমা বেগম এর পরিহিত ওড়না ভিকটিমের গলায় পেঁচিয়ে শক্ত করে ধরে রাখে। মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে গেলে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর মোড়ল ফাহিমা বেগম’র মৃতদেহ ওড়না দিয়ে টেনে স্কুলের বাইরে কাচা রাস্তার পাশে বাথরুমের ট্যাংকির কাছে নিয়ে যায়। টেংকির ঢাকনা ঊঠিয়ে ফাহিমা বেগম’র মৃতদেহ ট্যাংকির মধ্যে ফেলে দিয়ে মুখে ঢাকনা দিয়ে দেয়। যশোর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহাদী হাসানের কাছে ১৬৪ ধারা মোতাবেক জাহাঙ্গীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।

শেয়ার