করোনায় ফের বাড়ছে মৃত্যু-শনাক্ত
ওমিক্রন দ্রুত ছড়াচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন: প্রধানমন্ত্রী

সমাজের কথা ডেস্ক॥ করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের দাপটে দেশে এক দিনে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সাড়ে চার মাস পর আবার তিন হাজারের ঘর পেরিয়ে গেছে, তিন মাস পর মৃত্যু বেড়ে পৌঁছেছে দুই অংকের ঘরে। এদিকে, করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, “এই ভ্যারিয়ান্টটা দ্রুত ছড়াচ্ছে। এবং একেকটা পরিবারসহ আক্রান্ত হচ্ছে। এখানে আমি সবাইকে বলব যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে চলা এবং আমরা ইতোমধ্যে কিছু নির্দেশনা দিয়েছি সেই নির্দেশনাগুলো সবাই মেনে চলবেন।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৩ হাজার ৩৫৯ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের।
একদিনে এর চেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছিল গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর, সেদিন ৩ হাজার ৪৩৬ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছিল।
আর এর চেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর এসেছিল সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর, সেদিন মারা গিয়েছিলেন ১৬ জন। সবশেষ ২১ অক্টোবর ১০ জনের মৃত্যুর খবর এসেছিল, এরপর দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা দশের নিচেই ছিল।
নতুন রোগীদের নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত কোভিড রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪ হাজার ৬৬৪ জনে। তাদের মধ্যে ২৮ হাজার ১২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনাভাইরাসে।
২১ সপ্তাহ পর নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হারও ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। গত এক দিনে দেশে মোট ২৭ হাজার ৯২০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তাতে শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ। বুধবার এই হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ ছিল।
সরকারি হিসাবে গত এক দিনে দেশে সেরে উঠেছেন ৩০২ জন। তাদের নিয়ে এ পর্যন্ত ১৫ লাখ ৫১ হাজার ৯৫৫ জন সুস্থ হয়ে উঠলেন।
এই হিসাবে দেশে এখন সক্রিয় কোভিড রোগীর সংখ্যা ২৪ হাজার ৫৮৬ জন, যা আগের দিন ২১ হাজার ৫৪১ জন ছিল।

গত এক দিনে শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ২৭৫২ জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৮২ শতাংশ। দেশের ৬ জেলায় একদিনে কারও করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়নি। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৫; অর্থাৎ ভাইরাসের বিস্তার সারা দেশেই বাড়ছে।

সংক্রমণের মাত্রা বিবেচনায় সারাদেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ- এই তিন ভাগে ভাগ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে ঢাকা ও রাঙামাটিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’বা লাল জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দুই জেলায় নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ১০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশের মধ্যে।
শনাক্তের হার ৫ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে থাকা রাজশাহী, রংপুর, নাটোর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, যশোরকে রাখা হয়েছে হলুদ জোনে। দেশের বাকি ৫৪টি জেলা আছে সবুজ জোনে।
যে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ছয় জন পুরুষ, ছয় জন নারী। তাদের মধ্যে আটজন ছিলেন ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। এছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন একজন করে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে সাত জনের বয়স ছিল ষাটের বেশি। চার জনের বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছর এবং একজনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত এক দিনে পরীক্ষা করা ২৭ হাজার ৯২১টি নমুনা মিলিয়ে এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ৭৮ হাজার ২২১টি নমুনা।
এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা অনুযায়ী শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়েছিল ২০২০ সালের ৮ মার্চ। এ বছর ১২ জানুয়ারি তা ১৫ লাখ পেরিয়ে যায়। তার আগে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ব্যাপক বিস্তারের মধ্যে গতবছর ২৮ জুলাই দেশে রেকর্ড ১৬ হাজার ২৩০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়।

প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর ২০২০ সালের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত বছর ৫ ডিসেম্বর কোভিডে মোট মৃত্যু ২৮ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তার আগে ৫ অগাস্ট ও ১০ অগাস্ট ২৬৪ জন করে মৃত্যুর খবর আসে, যা মহামারীর মধ্যে এক দিনের সর্বোচ্চ সংখ্যা।
বিশ্বে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। আর শনাক্ত হয়েছে ৩১ কোটি ৭২ লাখের বেশি রোগী।

এদিকে, করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, “এই ভ্যারিয়ান্টটা দ্রুত ছড়াচ্ছে। এবং একেকটা পরিবারসহ আক্রান্ত হচ্ছে। এখানে আমি সবাইকে বলব যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে চলা এবং আমরা ইতোমধ্যে কিছু নির্দেশনা দিয়েছি সেই নির্দেশনাগুলো সবাই মেনে চলবেন।”

বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আগারগাঁওয়ে নবনির্মিত জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্সের উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করা ওমিক্রনের প্রভাবে বাংলাদেশেও করোনাভাইরাস সংক্রমণ আবার বাড়ছে। বুধবারও শনাক্ত হয়েছে প্রায় তিন হাজার রোগী। দৈনিক শনাক্তের হারও প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা ১২ দিন আগেও ছিল ৩ শতাংশের নিচে। এখন দেশে আক্রান্তদের ‘১৫-২০ শতাংশই’ ওমিক্রণের রোগী বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

এই প্রেক্ষাপটে ১১টি ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে সরকার, যা বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হচ্ছে।
এই বিধি-নিষেধে উন্মুক্ত স্থানে যে কোনো সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ থাকবে বন্ধ। শনিবার থেকে বাস-ট্রেন আবার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলবে। রেস্তোরাঁয় বসে খেতে দেখাতে হবে টিকা সনদ।
সব ধরনের বাহনের চালক ও সহকারীদের বাধ্যতামূলকভাবে টিকার সনদধারী হতে হবে। টিকা সনদ ছাড়া ১২ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারবে না।

অফিস-আদালতে এবং ঘরের বাইরে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। নিয়ম না মানলে শাস্তির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে।

এসব বিধি-নিষেধ মেনে চলার পাশাপাশি সবাইকে দ্রুত টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “যারা টিকা নেননি এখনও, দ্রুত নেবেন। আমরা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদেরও টিকা দেওয়া শুরু করেছি। টিকা নিলে অন্তত জীবনে বেঁচে থাকা যায়-এইটুকু হলো বাস্তব।”

আগারগাঁওয়ের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্সে এ অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার