চুরি হয়ে গেল বাগদাদ থেকে আনা শতবর্ষী ডেক

সমাজের কথা ডেস্ক ॥ ১০৯ বছর আগে বাগদাদ থেকে বিশাল আকৃতির ডেকটি এনেছিলেন মাওলানা খবির উদ্দিন আহমেদ আল কাদেরী। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের মগড়া পুকুরপাড় এলাকায় তাঁরই মাজারের পাশে একটি খোলা ঘরে দর্শনার্থীদের জন্য এই ডেক রাখা ছিল। একসময় মাজারের মণকে মণ খিচুড়ি রান্না হতো এই বিশাল পাত্রে। এই ডেক দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসতেন দর্শনার্থীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে খবির উদ্দিন মৌলভির বাড়ি থেকে প্রাচীন এই নিদর্শনটি চুরি হয়ে গেছে। স্থানীয় লোকজন জানান, ডেকটির উচ্চতা ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর চারপাশের পরিধি ১৪৮ ইঞ্চি বা প্রায় ১২ ফুট। ডেকটির ওপরের দিকে কাঁধ বরাবর চার কোণে চারটি রিং রয়েছে, যার একেকটির ওজন প্রায় ৪ কেজি। ডেকটি স্থানান্তরের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক ১৪–১৫ জন লোক লাগত এবং কমপক্ষে ৯-১০ মণ খিচুড়ি এই ডেকে রাখা যেত। ডেকটির ওপর খোদাই করে লেখা ছিল ‘ডেগ ওরুচে পিরানে পীর সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী-গোলাম ফকির-শ্রী মৌলবি খবির উদ্দিন কাদেরী, সাং-উৎরাইল, সন-১৩১৯’। বাকি কিছু লেখা অস্পষ্ট। স্থানীয় এক বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার অস্পষ্ট ফুটেজে এই প্রাচীন নিদর্শন চুরির দৃশ্য ধরা পড়েছে। গতকাল দিবাগত রাত ৩টার দিকে একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যানে করে কাপড়ে ঢাকা বড় কিছু একটা নিয়ে যাচ্ছে তিন-চারজন লোক। ধারণা করা হচ্ছে, ভ্যানে করেই বিশাল আকৃতির ডেকটি চুরি করে নিয়ে যায় চোর চক্র।

মৌলভি বাড়ির পীর মরহুম খবির উদ্দিন মৌলভির নাতি হাবিব মুনশি বলেন, ‘ফজরের নামাজের সময় মসজিদে এসে দেখি ডেকটি নাই। ডেক যেখানে রাখা ছিল, ওই ঘরের একটি খুঁটি ভেঙে ডেকটি বের করেছে চোরেরা। এই ডেক শত বছর আগের। মসজিদের পাশেই রাখা ছিল। অনেক দূর থেকে অসংখ্য মানুষ ডেকটি দেখতে আসত।’ ইউএনও বলেন, উদ্ধারের পর মাজার কর্তৃপক্ষ যদি প্রশাসনের কাছে ডেকটি সংরক্ষণের জন্য অনুরোধ জানায়, তবে ডেকটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হবে।

হাবিব মুনশি আরও বলেন, ‘আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন মরহুম মাওলানা খবির উদ্দিন আহমেদ আল কাদেরী ১০৯ বছর আগে বাগদাদ থেকে এই ডেক এনেছিলেন। এত দিন ডেকটি তাঁর মাজারের পাশে একটি খোলা ঘরেই ছিল। ডেকটি উদ্ধারে আমরা পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছি। আজ শুক্রবার সকালে দত্তপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে পুলিশের টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। প্রাচীন নিদর্শন ডেকটি উদ্ধারে তারা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউল মাতুব্বর বলেন, ‘ডেকটি প্রাচীন ইতিহাসের স্মারক। দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ডেকটি দেখতে আসতেন। প্রাচীন এই ঐতিহ্য চুরি হওয়ায় এলাকাবাসীর মন ভারাক্রান্ত। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি, দ্রুত ডেকটি যেন উদ্ধার করা হয়।’ জানতে চাইলে শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিরাজ হোসেন বলেন, ‘খবর পেয়ে পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে যায়। আমি নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এ ব্যাপারে মামলা হবে। তা ছাড়া সকাল থেকেই পুলিশ ডেক উদ্ধারে কাজ করছে। আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ পুলিশ সংগ্রহ করেছে। বিশাল আকৃতির ডেকটি যে–ই চুরি করুক না কেন, চোরসহ ডেকটি খুব দ্রুত উদ্ধার করা হবে।’

শিবচর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘প্রাচীন নিদর্শন ডেকটির ব্যাপারে আমরা অবগত। তবে মাজার কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কখনোই জানায়নি। তাই এত দিন ধরে প্রাচীন এই বিশাল আকৃতির ডেক মাজারের অধীনেই সংরক্ষিত ছিল। তবে গতকাল রাতে ঐতিহ্যবাহী ডেকটি চুরি হওয়ার খবর পেয়েছি আমরা। ডেকটি উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে। উদ্ধারের পর মাজার কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের কাছে ডেকটি সংরক্ষণের জন্য অনুরোধ জানায়, তবে ডেকটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হবে।’

শেয়ার