শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বাঙালি সনাতন ধর্মবিশ্বাসীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। শ্রীশ্রী চন্ডীপাঠের মধ্যদিয়ে শাস্ত্রীয় মতে মাঙ্গলিক নানা ক্রিয়াদী সম্পন্ন করে সোমবার মহাদুর্গাষষ্ঠী তিথীতে শ্রীশ্রী দেবী দুর্গাকে মর্তে আমন্ত্রণ ও অধিবাস সম্পন্নের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবের শুরু করা হয়।
আজ মঙ্গলবার মহাদুর্গাসপ্তমী তিথির সকালে পূজাস্থলে নবপ্রত্রিকা (কদলী বা রম্ভা বা কলা, কচু, হরিদ্রা বা হলুদ, জয়ন্তী, বিল্ব বা বেল, দাড়িম্ব বা ডালিম, অশোক, মান ও ধান উদ্ভিদের সমন্বয়ে নবপত্রিকা) প্রচলিত ভাষায় কলা বৌ প্রবেশের মধ্য দিয়ে দেবীর পূজা শুরু হবে।

যশোর রামকৃষ্ণ আশ্রম সূত্রে জানা গেছে, আজ ১২ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৬টায় মহাসপ্তমী পূজার কল্পারম্ভ।
উল্লেখ্য, নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে কল্পিত হয়। এই নয় দেবী হলেন রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচ্বাধিষ্ঠাত্রী কালিকা, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, জয়ন্ত্যাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী রক্তদন্তিকা, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামু-া ও ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী।

এই নয় দেবী একত্রে ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ নামে নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ’ মন্ত্রে পূজিতা হবেন।
মহাসপ্তমীর এদিন মন্দির-ম-পে শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী নবপত্রিকাকে স্নান করানোর পর নতুন শাড়ি পরিয়ে মূল পূজাস্থলে এনে দেবী দুর্গার ডান দিকে একটি কাঠের সিংহাসনে স্থাপন করা হবে। পূজাস্থলে নবপত্রিকা প্রবেশের পর দর্পণে দেবীকে সহ¯্র ছিদ্র জলাধার দিয়ে মহাস্নান করানো হবে। এরপর সাজ-সজ্জা প্রদানপূর্বক ভোগ আরতি ও ভক্তবৃন্দের অঞ্জলী প্রদান শেষে প্রসাদ বিতরণ করার রীতি রয়েছে। পূজার অংশ হিসেবে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে মঙ্গল আরতি।

এদিকে সোমবার ভোর থেকেই শহরের রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশন, নীলগঞ্জ মহাশ্মশান, বড়বাজার কালিবাড়ি, মাড়–য়া মন্দির, লালদিঘীর পাড় শ্রীশ্রী হরি মন্দির, বেজপাড়া পূজার মাঠ, সুধির বাবুর কাঠগোলা, ষষ্ঠিতলা পাড়া মন্দিরসহ শহরের বেশ কয়েকটি পূজা মন্দিরে ঘুরে দেখা গেছে নানান আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়ে এবারের দুর্গাপূজার শুরুর আনুষ্ঠানিকতা। এরবাইরে যশোর শহরতলীর শেখহাটি স্কুলপাড়ায় যশোর সার্বজনীন পূজা মন্দিরে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বেশ জাকজমকপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা হচ্ছে। মন্দিরটিতে প্রতিবছরই পূজার আচার অনুষ্ঠানের বাইরেও জনকল্যাণকর নানা কর্মসূচি পালিত হয়।

এদিকে পুজো শুরুর পর থেকে ঢাক ঢোল কাঁশির বাদ্যে মুখর হয়ে উঠেছে মন্দির ও ম-পের চারপাশ। একইসাথে মুখরিত হয়েছে ভক্তদের পদচারনায়। নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে শিশু কিশোররাও দেবী বন্দনায় মেতেছে। যশোর শহরের অধিকাংশ মন্দির ও মন্ডপগুলোয় সন্ধ্যার পর আলোকিত হয়ে ওঠে বর্ণিল অলোক সজ্জায়। মন্দির ও ম-পের আশপাশের রাস্তা ও বহুতল ভবনগুলো সজ্জিত করা হয়েছে রঙবেরঙের আলোকসজ্জায়। মন্দির ও ম-পের আশপাশের বসেছে শারদীয় উৎসবকালিন সেই চিরচেনা মেলাও। অস্থায়ী এ মেলায় বসেছে মাটির, কাসার, পিতলের তৈরি বাহারি সব বাসনকোসনের দোকান, মুড়ি, মুড়কি, খই, বাতাসা, পাপড়ের দোকান। নানান রকম ভাজা পোড়ার পসরা সাজিয়ে দোকান বসেছে সেখানে।

এদিকে পৌর এলাকার প্রায় মন্দির ও ম-পে আয়োজক কমিটির উদ্যোগে হবে আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনাসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি।

যশোর রামকৃষ্ণ আশ্রমের দুর্গাপুজোর প্রধান পুরোহিত শক্তি প্রসাদ গাঙ্গুলী জানান, পঞ্জিকা মতে এবছর দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসছেন ঘটকে। অর্থাৎ এবার দুর্গা দেবীর পৃথিবীলোকে আগমনের বাহন হলো ঘোড়া। আবার দশমীর দিন ফিরবেন দোলায় চেপে। শাস্ত্রজ্ঞরা মনে করেন, দেবীর ঘটকে আগমনের প্রভাব ‘ছত্রভঙ্গ’। ঘোটকে মায়ের পদার্পণ হলে; ঘোড়ার গতির মতোই অশান্তির তীব্রতা বাড়ে। সেক্ষেত্রে সামাজিক থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খানিকটা বেসামাল হওয়ার ইঙ্গিত থাকে। এমন অবস্থায় সংঘাত, যুদ্ধ, হানাহানি লেগে থাকার আশঙ্কা থাকে। আর দেবীর দোলায় গমন মড়কের পূর্বাভাস।

শেয়ার