যশোর শিক্ষাবোর্ডের আড়াই কোটি টাকা লোপাট
দুর্নীতিবাজরা রক্ষা পেতে নাটকের মঞ্চায়ন !

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোর শিক্ষাবোর্ডের আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের মধ্যে ‘জালিয়াত চক্রের’ সদস্য হিসাব সহকারী আব্দুস সালামের ১৫ লক্ষাধিক টাকা ফেরত ও চিঠি পাঠানো নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। রোববার রাতে বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর বোর্ডের এক আনসার সদস্য’র মাধ্যমে পে অর্ডার ও একটি চিঠি পাঠানোর পর থেকে ঘটনা নিয়ে নানান নাটকীয়তা দেখা দিয়েছে। সপরিবারে পলাতক থেকে বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে পে-অর্ডার ও চিঠি পাঠানোর সাথে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের আড়াল কিংবা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান-সচিবসহ জালিয়াত চক্রটি নিজেদের রক্ষা করতে এমন নাটকীয়তা সাজিয়েছে বলে অভিযোগ বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তার। অন্যদিকে দুদক বলছে, ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনা চাপা দিতে কোনো পক্ষ নাটক সাজালেও; ঘটনার সাথে জড়িতদের কোনো ছাড় নেই।

যশোর শিক্ষাবোর্ডের আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় চক্রের সদস্য হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম রোববার রাতে ১৫ লাখ টাকার পে অর্ডার এবং একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। গেটে থাকা একজন নিরাপত্তা কর্মীর কাছে ১৫ লাখ ৪২ হাজার টাকার পে অর্ডারের সাথে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে আব্দুস সালাম লিখেছেন ‘অফিসের চেক জালিয়াতির ঘটনার জন্যে আমি ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। শিক্ষাবোর্ডে কর্মরত অন্য কেউ বা ভেনাস প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং এবং শাহীলাল স্টোরের কেউ চেক জালিয়াতি কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। পূর্বপরিচিতির সূত্রে বর্ণিত দুটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আমি টাকা গ্রহণ করেছি এবং আমার নিজ প্রয়োজনে খরচ করে ফেলেছি। রোববার ১৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা ফেরত দিলাম। বাকি টাকাও পর্যায়ক্রমে আমি ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করছি। এজন্য আপনার কাছে ক্ষমা ও টাকা পরিশোধের সময় প্রার্থনা করছি।’ চিঠি পাওয়ার পর থেকে শিক্ষাবোর্ডের অর্থ আত্মসাৎ নিয়ে নানা নাটকীয়তা দেখা দিয়েছে। একদিকে বোর্ডের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক তদন্ত শুরু করেছে দুদক। অন্যদিকে পলাতক হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম অজ্ঞাত স্থান থেকে ১৫ লক্ষাধিক টাকা ফেরতের সাথে অন্যদের বাঁচানোর লক্ষ্যে দোষ নিজের ওপর নিয়ে চিঠি লিখেছেন। এদিকে ঘটনা জানাজানি হয়ে পড়লে অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ভেনাস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের মালিক শরিফুল ইসলাম বাবু টাকা ফেরত দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিন্তু এখন কর্মচারী আব্দুস সালাম গোটা জালিয়াতির দায় একাই নিলেন। এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে কি না তা অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই বিষয়ে জানতে যশোর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোল্লা আমীর হোসেনের নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে শিক্ষাবোর্ডের সচিব এএমএইচ আলী রেজা সমাজের কথাকে জানান, চেক জালিয়াতির ঘটনা জানাজানির পর থেকেই হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন। রোববার রাতে সালামের কোনো স্বজনের মাধ্যমে একটি পে অর্ডারের মাধ্যমে বোর্ডের হিসাব নাম্বারে ১৫ লাখ ৪২ হাজার টাকার একটি চেক ও একটি চিঠি তিনি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে বোর্ডের চেক জালিয়াতির সাথে তিনি একাই জড়িত বলে স্বীকার করেছেন। তার চিঠি পাওয়ার পরে বোর্ড ব্যবস্থাপনা কমিটি জরুরি সভার আয়োজন করে। যশোর শিক্ষাবোর্ডের আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় যশোর বোর্ড যে তদন্ত কমিটি করেছে, সেখানে যদি আব্দুস সালাম সম্পৃক্ত থাকে তাহলে তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ দিবে সেটা বাস্তবায়ন করবে যশোর বোর্ড। এমনকি আব্দুস সালাম বহিষ্কারও হতে পারে বলে জানান তিনি।

চলতি অর্থবছরে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড সরকারি কোষাগারে জমার জন্য আয়কর ও ভ্যাট বাবদ দশ হাজার ৩৬ টাকার নয়টি চেক ইস্যু করে। এই নয়টি চেক জালিয়াতি করে ভেনাস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের নামে এক কোটি ৮৯ লাখ ১২ হাজার দশ টাকা এবং শাহীলাল স্টোরের নামে ৬১ লাখ ৩২ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। সরকারি ছুটি থাকায় ঘটনা প্রকাশ্যে আসার দুইদিন পর রোববার বোর্ডের সচিব এএমএইচ আলী আর রেজা দুদক কার্যালয়ে গিয়ে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযোগ দাখিল করেন। এরপর একইদিন বেলা ১২টার দিকে দুদক কর্মকর্তারা বোর্ডে গিয়ে তদন্ত এবং কাগজপত্র সংগ্রহ করেন।
এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নাজমুচ্ছায়াদাত বলেন, বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম বোর্ডে একটি পে-অর্ডার ও একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলে শুনেছি। কিন্তু এতে অন্যদের রক্ষা করা যাবে না। আমরা কাগজপত্র দেখছি; সেখানে কার কার সিগনেচার রয়েছে-বিহাইন্ড দি সিন যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

শেয়ার