করোনাকালে যশোরে বেড়েছে বাল্যবিবাহ

 অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে অভিভাবকরা গোপনে মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিয়েছেন

জাহিদ হাসান
এসএসসি পরীক্ষার্থী শিমলা দত্ত (১৫)। করোনা মহামারির কারণে বিদ্যালয় বন্ধ থাকাকালীন সময়ে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছেন চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি শহীদ মশিয়ুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের এই শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিন পর স্কুল খোলায় নিয়মিত আগের মতোই ক্লাস করছে সে। বিয়ের পরও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে সে স্কুলে এসেছে। তবে তার প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না তা নিয়ে আছে সংশয়ে। শিমলার মত খুব কম সংখ্যক ছাত্রীই বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে। আর বেশিরভাগের শিক্ষাজীবন শেষ হয়েছে মাধ্যমিকের গণ্ডিতেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের কারণে দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় যশোরে মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রীদের বাল্যবিবাহ বেড়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সংকটে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকরা গোপনেই মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিয়েছেন। মাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীর বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। বাল্যবিয়ের শিকার এসএসসি পরীক্ষার্থীরা লেখাপড়া চালিয়ে গেলেও অন্যরা ঝরে যাচ্ছে। তবে সঠিক পরিসংখ্যান নেই জেলা শিক্ষা বিভাগের হাতে। একইসাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম সপ্তাহে অনুপস্থিতির হার ১৫-২০ শতাংশ। কয়েক সপ্তাহ গেলে উপস্থিতির হার বাড়বে। অপরদিকে বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমেছে ব্যাপক হারে। ওইসব স্কুল ছেড়ে তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসায় ভর্তি হয়েছে। বন্ধ হয়েছে বেশকিছু বেসরকারি স্কুল-কলেজ।

জানা যায়, যশোর জেলায় দুই হাজার ২২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে মাধ্যমিক স্তরে ৫২৭টি স্কুল ও ৩১০টি মাদরাসা, ৯১টি কলেজ ও ১৫টি কলেজিয়েট স্কুল, প্রাথমিক স্তরে এক হাজার ২৮৫ টি স্কুল রয়েছে। জেলার ২ হাজার ২২৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিন লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর খুলেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গত এক সপ্তাহে জেলায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ন্যূনতম ৮০ শতাংশ। করোনাকালে মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রীদের বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেড়েছে। অধিকাংশ স্কুলের ছাত্রীদের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বাল্যবিয়ে হয়েছে। শহরের স্কুলে দরিদ্র ও দিনমজুর পরিবারের মেয়েদের বাল্যবিয়ের প্রবণতা বেশি।

যশোরের চৌগাছা উপজেলার আন্দুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত ১৮জন ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ জন লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছে। বাকিরা লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। আন্দুলিয়া স্কুলের একজন শিক্ষক নামপ্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্কুলের ছাত্রীদের মধ্যে যাদের বাল্য বিয়ে হয়েছে, তাদের অধিকাংশই একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ। বর্ণ বৈষম্যের কারণে তাদের অভিভাবকদের দাবি, মেয়েকে বেশি লেখাপড়া করালে যোগ্য পাত্র খুঁজে পাবে না। তাই অল্প বয়সে কম শিক্ষিত মেয়েদের বিয়ে দেয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে বেশি। করোনাকালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকরা মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিচ্ছে।

যশোরের ঝিকরগাছা বল্লা বিএনকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১২৩ জনের মধ্যে ৩০ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। বিদ্যালয়ে ২০২০ সালে ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১২৩ জন। বিদ্যালয় খোলার পর দেখা গেছে এদের মধ্যে ৩০ জন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। বল্লা বিএনকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকবুল হোসেন বলেন, অসচেতনতার কারণে বাল্যবিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে কাজীরা বাল্যবিয়েকে যতক্ষণ না বলবে ততক্ষণ, বাল্যবিয়ে বন্ধ করা যাবে না।

চৌগাছা উপজেলার মাকাপুর-বল্লভপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, করোনাকালে স্কুলের অন্তত ৮জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। অভিভাবকদের অসচেতনতায় বাল্যবিয়ের প্রবণতা বাড়ছে। অভিভাবকরা মনে করে মেয়ে বড় হচ্ছে, মানে বোঝা হয়ে যাচ্ছে। তাকে বিয়ে দিতে পারলেই চাপমুক্ত হতে পারবে। এজন্য তারা বাল্য অবস্থায় বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।

চৌগাছার মুক্তিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান আলী বলেন, করোনাকালে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির অন্তত ১৭জন ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকায় মেয়েরা বাড়িতেই থাকতো। অভিভাবকদের সামনেই ঘোরাফেরা করেছে। তারা মনে করেছে মেয়ে বড় হয়ে গেছে এখনই বিয়ে দিতে হবে। হয়ত অনেকে ভাল পাত্রের সন্ধানও পেয়েছে। এজন্য তারা বিয়ে দিয়েছে। মূলত অভিভাবকদের অজ্ঞতার কারণে বাল্যবিয়ে বেড়েছে।

যশোর শহরের আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন বলেন, অধিকাংশই শ্রমজীবী পরিবারের মেয়েরা এই স্কুলে লেখাপড়া করে। করোনাকালে তাদের দুর্দিন গেছে। অনেকে ভাতের মাড় কিংবা চিড়া খেয়ে দিন পার করেছে। শুনে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেককেই সহযোগিতা করেছি। অনেকে অভাবের কারণে গ্রামে চলে গেছে। গোপনে অনেক মেয়ের বিয়ে দিয়েছে অভিভাবকরা।

যশোর শহরের মধুসূদন তারাপ্রসন্ন (এমএসটিপি) কলেজিয়েট গার্লস স্কুলের অধ্যক্ষ খায়রুল আনাম বলেন, আমাদের স্কুলে সব শ্রেণিপেশার মানুষের মেয়েরা লেখাপড়া করে। করোনাকালে কতজনের বাল্যবিয়ে হয়েছে সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে দুই-একজনের বিয়ে হয়েছে শুনেছি।’

যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম বলেন, শিক্ষার্থী ঝরেপড়া ও অনুপস্থিতির সঠিক পরিসংখ্যান পেতে আরও দুই-এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ মাত্র এক সপ্তাহে এই পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না। বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের উপরে শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত হচ্ছে। এ হার আরও বাড়বে বলে আশাবাদী।’

এ প্রসঙ্গে যশোর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার একেএম গোলাম আযম সমাজের কথাকে বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে করোনাকালে গোপনে অনেক শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। তবে তার সংখ্যা কত, সেই তথ্য এখনো আমরা সংগ্রহ করিনি। অনেকের বিয়ে হয়ে গেলেও ক্লাস করছে শুনেছি। তিনি আরও বলেন, ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। প্রতিদিন স্কুল ভিজিট করছি। উপস্থিতির হার ৮০-৮৫ শতাংশ পেয়েছি। সরকারিভাবে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রস্তুতের কোনো নির্দেশনা না পেলেও আমরা তালিকা প্রস্তুত করছি। আগামী মাসে অনুপস্থিতি ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর তথ্য পাওয়া যাবে।

শেয়ার