ফুটবলে স্বর্ণযুগের রেফারি আনসারুল ইসলাম মিন্টু
জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের তালিকায় স্থান পাননি ফিফা স্বীকৃত রেফারি

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ রেফারি কাজী আনসারুল ইসলাম মিন্টু। সোনালী ফুটবল যুগের এক অনন্য নাম। আশির দশকে ফুটবলের বাঁধভাঙা জনপ্রিয়তার কালে মোহামেডান-আবাহনীর হাইভোল্টেজ ম্যাচ সবচেয়ে বেশি পরিচালনা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়; আন্তর্জাতিক অনেক ম্যাচও পরিচালনা করেন যশোরের এই গুণীব্যক্তি। তারকাখঁচিত এই রেফারি পাহাড়সম উত্তেজনা ও চাপ জয় করে বারবার আস্থার প্রতীক হিসেবে খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন বাফুফের কাছে। সেইসময়ে বিগম্যাচ পরিচালনার চ্যালেঞ্জ আর ফুটবলের মারকুটে দর্শকদের কথা নিয়ে সমাজের কথার আজকের প্রতিবেদন।

কাজী আনসারুল ইসলাম মিন্টু পেশাদার রেফারি হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে যশোর মাঠের ফুটবলার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতার আগে থেকেই যশোর লীগে নিয়মিতভাবে যশোর কালেক্টরেট ও যশোর টাউন ক্লাবের পক্ষে খেলতেন। ফুটবল খেলতে খেলতে একসময় সিদ্ধান্ত নেন রেফারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। এই আকাক্সক্ষা একসময় যশোরের বাল্যবন্ধু আতাউল হক মল্লিকের কাছে ব্যক্ত করেন।

আতাউল হক মল্লিক ততদিনে যশোর থেকে এসে ঢাকা ফুটবল লীগে খেলা পরিচালনা শুরু করেছেন। ৭৫ সালের কোনো এক সময়ে ঢাকাতে বাংলাদেশ রেফারিজ এসোসিয়েশন নতুন রেফারি তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। আতাউল হক মল্লিকের অনুপ্রেরণায় রেফারি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেন আনসারুল ইসলাম মিন্টু। প্রশিক্ষণে তিনি উত্তীর্ণ হয়ে তৃতীয় গ্রেডের রেফারি হিসেবে স্বীকৃত হন।

প্রশিক্ষণ শেষে যশোরে এসে নিয়মিতভাবে স্থানীয় পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করতে থাকেন। এরপর ৭৬ সালে তিনি দ্বিতীয় গ্রেডের রেফারি হিসেবে স্বীকৃত হন। এর মাত্র একবছর পরেই ৭৮ সালে প্রথম শ্রেণির রেফারিতে উত্তীর্ণ হন। বলা যায় এরপরই তার রেফারি জীবনের ভাগ্য দরজা খুলে যায়। ওই বছরই তার ডাক পড়ে ঢাকা ফুটবল লীগে খেলা পরিচালনার জন্যে।

প্রথমে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব এবং ওয়ারির মধ্যকার একটি ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পান। প্রথম ম্যাচ পরিচালনা করে সম্মানী হিসেবে তিনি মাত্র ১৫০ টাকা পান। ওই ম্যাচে যশোরে দুই কৃতী ফুটবলার সাথী ও কালামও খেলেন। এর এক বছর পরেই বড় ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি। জনপ্রিয় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং ওয়ারি ক্লাবের ম্যাচ পরিচালনার মধ্যে দিয়ে এক নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেন।

তবে ৮৪ সালে হঠাৎ করেই তার জীবনে আসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। ওই বছর অভিজ্ঞ রেফারিদেরকে বাদ দিয়ে তার ওপর আসে মোহামেডান ও আবাহনীর মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব। সে সময় মোহামেডান এবং আবাহনীর ম্যাচ মানেই সারা দেশজুড়ে এক অসীম উত্তেজনা। গ্যালারিতে বসা রক্ত টগবগ হাজার হাজার মারকুটে দর্শকদের চাপ মাথায় নিয়েই রেফারিদের খেলা পরিচালনা করতে হতো। কিন্তু ওই ম্যাচ দক্ষতার সাথে পরিচালনা করে যেনো অমরত্ব লাভ করেন তিনি।

তবে ওই ম্যাচ খেলার মধ্যে দিয়েই ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন ফুটবলের কিংবদন্তী কাজী সালাহউদ্দিন। এই ম্যাচে বাদল রায়ের গোলে জয়ী হয়েছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব।

এই ম্যাচের কথা স্মরণে এনে কাজী আনসারুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘আমি তখন যশোরে। হঠাৎ করেই রেফারিজ এসোসিয়েসন থেকে আমাকে ঢাকায় যাওয়ার কথা বলা হলো। পরের দিন মোহামেডান-আবাহনীর মাঠ কাঁপানো ম্যাচ। আটজন রেফারি রয়েছেন প্যানেলে। কার ওপর কী দায়িত্ব আসছে কারো জানা নেই। খেলা শুরু হওয়ার একটু আগে জানতে পারলাম গুরুদায়িত্বটা আমাকেই দেওয়া হয়েছে।’

৮৩ সালে কাজী আনসারুল ইসলাম মিন্টু আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পান। সে বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে মোট চারটি ম্যাচ পরিচালনা করেন তিনি। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেন কলকাতা মোহামেডান এবং চায়নার একটি ক্লাবের মধ্যেকার খেলা। ৮৫ সালে তিনি পাকিস্তানে যান কায়েদি আজম ট্রফি ম্যাচ পরিচালনার জন্যে। এ টুর্নামেন্টে মোট ৩টি ম্যাচ পরিচালনা করেন। ক্যারিয়ারে ১০টির মতো আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছেন আনসারুল ইসলাম মিন্টু। ৮৭ তে ভারতে অনুষ্ঠিত সার্ক ফুটবলে ৩টি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন।’

রেফারি জীবনের সোনালী সময়ের কথা স্মরণে এনে আনসারুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘যতদিন মাঠে বাঁশি হাতে দাঁড়িয়েছি ততদিনই নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থেকেছি। দৃঢ়তার সাথে প্রতিটি ম্যাচ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে স্বচেষ্ট থেকেছি। প্রতিটি সিদ্ধান্তই বিচক্ষণতার সাথে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’

স্মৃতি হাতড়িয়ে বলেন, সে সময় অনেকে মনে করতেন আমি হলাম ‘মোহামেডান ফেভারিট রেফারি’। বিশেষ করে আবাহনীর সমর্থকেরা এমনটিই মনে করতেন। কিন্তু সেই ভুল ভাঙতে সময় লাগেনি।
তিনি বলেন, ৮৮ সালে মোহামেডান-রহমতগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মোহামেডান কোনোভাবেই গোল পাচ্ছিল না। একসময় মোহামেডানের খেলোয়াড়রা একেবারে অধৈর্য হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় খেলার শেষপ্রান্তে ইরানি ফুটবলার নালজেগার ফাউল করে। আমি লালকার্ড বের করি, নালজেগার মাঠের বাইরে চলে যায়। লালকার্ড দেখানোর পরে সে কি উত্তেজনা মাঠজুড়ে। শেষ পর্যন্ত ওই ম্যাচে মোহামেডান ড্র করে। মনে আছে সেদিন আবাহনীর অনেক সমর্থকেরই আমার সম্পর্কে ভুল ভাঙে।
আশির দশকের দেশের সেরা তারকা ফুটবলারদের কাছ থেকে দেখেছেন আনসারুল ইসলাম মিন্টু। সবার খেলা এখনও তার চোখে ভাসে। কাজী সালাহউদ্দিন, আসলাম, বাদল রায়, সালাম, চুন্নু, বাবুল, জনি, মুন্না, রঞ্জিত, রুমি, মনু-সবার খেলাই তার মুখস্ত। আসলামের গোল করার দক্ষতা এখনও তাকে টানে। বলেন, ওর ব্যক্তিগত স্কিল ততোটা উঁচুমানের ছিল না। কিন্তু ডি-বক্সের হিরো আসলাম। গোল কীভাবে করতে হয় ভাল জানতো। মুন্না মেজাজি হলেও কোনোদিন খারাপ ব্যবহার করেনি। ফাউল করার পরও বল নিজ হাতে তুলে আনতো। কাজী সালাহউদ্দিন, বাদল রায়, চুন্নু, বাবুলের সেই আন্তরিক আচরণ এখনও মনে দাগ কেটে আছে।
আনসারুল ইসলাম মিন্টুর বর্তমান বয়স ৭৫। যশোরের ঘোপ এলাকায় নিজের বাড়িতে থাকেন। দুই সন্তানের জনক তিনি। তার দুই ছেলে কাজী ইমরান ওয়াহিদ ও কাজী এরফান ওয়াহিদ। স্ত্রীর নাম সাবিনা ইসলাম। জীবনের প্রান্তে বেলাতেও ফুটবল তাকে টানে। যশোরে কোনো টুর্নামেন্ট হলে এখনও চলে যান মাঠে। যশোরের বেশ কয়েকজন তরুণ রেফারি তারই হাতে তৈরি।

দেশের বিবর্ণ ফুটবল দেখে অনেকের মতো তারও মন খারাপ হয়। বলেন, ‘যে ফুটবলের আমরা সাক্ষী, তার কিছুই এখন নেই। ফুটবলে সেই সোনালী দিন ফিরে আসুক এটিই কাম্য’।
সম্প্রতি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য ৮৮ জন ক্রীড়াব্যক্তিত্বের নাম ঘোষিত হলেও সেখানে নেই কাজী আনসারুল ইসলাম মিন্টুর নাম। উল্লেখ্য, ফিফা স্বীকৃত এই রেফারি ৯৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণাঢ্য রেফারি জীবনের সমাপ্তি টানেন।

শেয়ার