বালু ভর্তি সস্তা জিও ব্যাগ চলে যাচ্ছে নদীতে ॥ আশাশুনি দয়ারঘাট বেড়িবাঁধ নির্মান কাজে শুভঙ্করের ফাঁকি

ফায়জুল কবির, আশাশুনি (সাতক্ষীরা)॥ সাতক্ষীরার আশাশুনি সদরের দয়ারঘাট বেড়িবাঁধ নির্মান কাজে শুভঙ্করের ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। গত ঈদের আগে তড়িঘড়ি করে রাস্তায় ও রিভারসাইটে মাটি না দিয়ে কার্পেট বিছিয়ে বালু ভর্তি সস্তা জিও ব্যাগ দিয়ে এলাকা ছেড়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ফলে কাজ শেষ হতে না হতে বালির ব্যাগ সরে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এতে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধটি আগের মতই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এছাড়া স্থানীয় শ্রমিকদের টাকা পরিশোধ না করে চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকজনদের বিরুদ্ধে।

সরজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রলয়ঙ্করী ঝড় আম্ফানে ভেঙে যাওয়া দয়ারঘাট গ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪ নং পোল্ডারে খোলপেটুয়া নদীর ৩টি ব্রিচ ক্লোজিং শেষে প্রায় ৫৩৫ মিটার এলাকায় নদী সংরক্ষণ করতে বালি ভর্তি জিও ব্যাগ সাজানো হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যানুযায়ী ডব্লিউ-০৩-২০২০-২১ প্যাকেজের নির্মান কাজে প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকার এ কাজে পুকুর চুরি করা হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে দয়ারঘাট গ্রামের নিমাই মন্ডলের বাড়ীর সামনে ও ব্রাইট স্পোর্টিং ক্লাবের সামনে রাস্তার স্লোবের বালির বস্তা ধ্বসে নদীতে চলে যাচ্ছে। ঈদের পরে এসে কাজ শুরু করব বলে চলে যাওয়ার পর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আর খোঁজ নেই। এদিকে বাঁধ নির্মান করতে গিয়ে কান্ট্রি সাইটে ৫ ফুটের মধ্যে স্কেবেটর মেশিন দিয়ে গভীর গর্ত করে মাটি তুলে বাঁধ নির্মান করা হয়। সূত্রমতে মনি দোকানদারের পুকুরে প্রথমে বালি ভরাট করে সেই বালি জিও ব্যাগে ভরে বাঁধে লাগানো হয়।

এছাড়া আব্দুল হাদির ঘের ও সুন্দরবন হ্যাচারীর পুকুর থেকে একই কায়দায় প্রথমে বালি ভরাট দিয়ে সেই বালিতে রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। এ সময় স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা বাঁধা দিলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেন আমরা এগুলো অবশ্যই ভরাট করে দেব। তবে বালি উত্তোলনের জন্য মেশিন নিয়ে এলেও অজ্ঞাতকারণে ভরাট না করেই মেশিনটি ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আজও তাদের কিছু পাইপ পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলা রয়েছে।

এদিকে বৃষ্টিতে বাঁধের বালি ধুয়ে স্থানে স্থানে পুরানো বাঁধের থেকেও নিচু হয়ে গেছে। ফলে বালির বস্তা সরে যাওয়া ও নিচু বাঁধের কারনে স্থানীয়দের আশঙ্কা কাটছেনা।

স্থানীয় বাসিন্দা বিভূতি ভূষণ বলেন- চলতি বছরের ৭ এপ্রিল কাজ পায় কুষ্টিয়া, চৌরহাসের মো. নাসির উদ্দীন মোল্যার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমে বরাবরের মত বাঁধ মেরামতের কোন প্রকল্প পরিচিতি দেওয়া হয়নি। পরে সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক এমপি ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে প্রকল্প পরিচিতি টাঙানোর নির্দেশ দিলে বাঁধের মূল নকশা ও প্রকল্প পরিচিতির দুটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়।

সে সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, বাঁধটির ১৪ ফুট প্রস্থ, টপ আড়াই ফুট, কান্ট্রি সাইড ২২ ফুট ও রিভার সাইট ৩০ ফুট করে স্লোবে বালি ভর্তি জিও ব্যাগ দিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হবে।

কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার পর দেখা যায় সে নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। কাজ হচ্ছে পূরানো রাস্তার গাঁ দিয়ে। ওই রাস্তার মাঝ বরাবর ধরে ১৪ ফুট মাথা তৈরীর কাজ করা হচ্ছে। উচ্চতা আড়াই ফুট করার কথা বললেও করা হচ্ছে মাত্র এক থেকে দেড় ফুট। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান স ম সেলিম রেজা বাঁধা দিলে আবার পুরানো রাস্তার স্লোব থেকে ১৪ ফুট মাথা করা হয়েছে। কিন্তু রাস্তার উচ্চতা সেই একই রকম করা হয়।
রিভার সাইটে ৩০ ফুট ও কান্ট্রি সাইটে ২২ ফুট স্লোব করার কথা থাকলেও কোন নিয়মই মানা হয়নি। কান্ট্রি সাইটে তো মোটেই নয়। স্থানীয়রা জানান, শ্রমিকদের পাশাপাশি স্কেবেটর মেশিন দিয়েও শুকনো ঝরঝরে ধুলো মাটি দেওয়া হয়েছে নতুন বাঁধে।

আবার রিভার সাইটে প্রয়োজনীয় মাটি দিয়ে স্লোব না করে যেনতেন প্রকারে সমান করে কার্পেট বিছিয়ে বালির বস্তা সাজানো হয়েছে। ঐ সময় কখনও বৃষ্টি কখনও করোনা আবার কখনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে পূঁজি করে বাঁধ নির্মানে ব্যাপক তড়িঘড়ি করা হয়েছে।

দয়ারঘাট গ্রামের গণেশ মন্ডল বলেন- স্লোব থেকে বস্তা যাতে সরে না যায় সে জন্যে আমরা বাঁশ বা বল্লির পাইলিং করে দিতে বলেছিলাম কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমাদের পরামর্শের কোন মূল্যায়ন করেননি। এখন নিচের বস্তাগুলো ধীরে ধীরে নদীতে সরে যাওয়ায় বাঁধের উপরিভাগের স্লোব থেকে বস্তাগুলি নেমে ঝুঁকির পরিমান বাড়িয়ে তুলেছে। অনতিবিলম্বে যদি বাঁধের কান্ট্রি সাইটে তাদের করে যাওয়া গর্ত গুলি বালি দিয়ে ভরাট করা না হয় তবে প্রত্যেক ভাঁটিতে পানি চোঁয়াতে থাকবে। আর বছর ঘুরতে না ঘুরতে বাঁধটি যা ছিল তাতে পরিনত হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান এসডিও মাজহারুল ইসলাম এবং এসও রাব্বি হাসানের উপস্থিতিতে কন্ট্রাকটর সম্পূর্ণ ইচ্ছামত কাজ করে গেছেন। রাস্তা উঁচু করার কথা বললেও তারা কোন আমলেই নেইনি। রাস্তার নিচে দেড় ফুট জায়গা না রেখেই সেখান থেকে গর্ত করে মাটি তুলে রাস্তার উপরে দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে জেলেখালি গ্রামের নিমতলা নামক স্থানে বাঁধ মেরামতে কাজ পেয়েছিলেন বাবুল হোসেন নামে এক ঠিকাদার। তার কাছ থেকে মৌখিকভাবে কাজ বাগিয়ে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মচারী। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানটিতেই তিনি বাঁধের দুপাশে কোন মাটি না দিয়ে খাঁড়া উঁচু করে নদীর দিকটায় কার্পেট বিছিয়ে কাজ শেষ করেন। কিন্তু এখানেও বৃষ্টিতে তাদের মেকআপ গলিয়ে দেয়। এ অবস্থায় খাঁড়া রাস্তার দুধারেই মাটি বসে বাঁধটি ফের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় শ্রমিক গৌতম সানা জানান- আমিসহ ৩ জন বাঁধে কাজ করেছি। কিন্তু ঈদের পর এসে টাকা দেব বলে তারা আমাদের প্রায় ৮ হাজার টাকা আজও দেয়নি আর বাঁধের পাশে আসেনি।

এ ব্যাপারে এসও রাব্বি হাসান বলেন- ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা সামাদ সাহেবকে বারবার কাজটি সম্পন্ন করতে বলছি। কিন্তু তারা বৃষ্টির অজুহাতে আজও কাজে আসেনি। এক বছরের মধ্যে বাঁধের যেকোন সমস্যা তারা দেখবেন। রাস্তার ধারে যে মাটি কাটা হয়েছে সেসব খানাখন্দ গুলো আমরা ভরাট করে দেব। আমাদের ড্রেজার মেশিনটি এখানে আনার পরে প্রতাপনগরের অবস্থা খারাপ হওয়ায় বর্তমানে সেখানে কাজ করছে। এছাড়া রিভারসাইটে যেসব স্লোবে মাটি নেই সেখানে পূণরায় মেরামত করতে হবে। আর নিমতলায় যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে তাকে সঠিক কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন বাঁধের যে উচ্চতা হওয়ার কথা নকশায় উল্লেখ আছে সে মোতাবেকই কাজ সম্পন্ন করা হবে। অনিয়মের সাথে কোন আপোষ করব না।

এদিকে বানভাসী মানুষের বছরের পর বছর ধরে জীবন যাপনের কষ্ট লাঘবের জন্যে যুগোপযোগী উঁচু ও টেঁকসই মজবুত করে বাঁধ নির্মান এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

শেয়ার