চৌগাছার এবারও বলুহ মেলা হচ্ছে না

ইয়াকুব আলী, চৌগাছা থেকে॥ এবারও যশোরের চৌগাছার ঐতিহ্যবাহী পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) মেলা হচ্ছে না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে না আসায় মেলার অনুমতি দেয়নি প্রশাসন। এনিয়ে গত দু’বছর মেলা হচ্ছে না।

যশোর-ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরা জেলার ২০/৩০ টি উপজেলার মানুষ মেলা উপভোগ করতে আসেন। মেলা থেকে আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রীও কিনে নিয়ে যান। কপোতাক্ষ নদের তীর থেকে হাজারাখানা পীর বলুহ দেওয়ান দাখিল মাদরাসা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার বিস্তৃত এই মেলার আয়াতন ।

ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খেলনা ব্যবসায়ীরা এসেছেন। শুধাংশু রায়, আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল মাজেদ, পিন্টু ও সাদ্দাম হোসেনসহ আরও কয়েকজন জানিয়েছেন, যেসব পণ্য আনা হয়েছে তা ফিরিয়ে নেয়ার মতো ভাড়ার টাকাও নেই। তিনদিন ধরে এখানে বসে বসেই খাচ্ছি। মেলা হবে সেই আশায় আমরা আজ পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিলাম। এখন নিরুপায় হয়ে বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে।

উল্লেখ্য, প্রতি বাংলাসনের ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে কপোতাক্ষ নদের তীরে পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) রওজা শরীফকে ঘিরে বসে এই মেলা। কপোতাক্ষ নদের পাশে উঁচু ঢিবির ওপর বলুহ দেওয়ানের (রহ) রওজা অবস্থিত। মেলার সময়ে হাজরাখানাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে পড়ে ব্যস্ততার ধুম।
এ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে ঈদে-পূজায় না হলেও মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাই দাওয়াত করার রেওয়াজ রয়েছে। যাকে ঘিরে এই মেলা তার সম্পর্কে রয়েছে নানা মিথ। লোক মুখে প্রকাশ পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। ‘তিনি যা বলতেন তাই হতো।’

তার জন্ম-মৃত্যুসহ জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত ছিলো রহস্যে ঘেরা। তিনি একই উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের ছুটি বিশ্বাসের ছেলে। তার জ্যেষ্ঠ ভক্তদের মতে, তিনি ৩-৪শ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন।

পীর বলুহ (রহ) এর অনেক কিংবিদন্তি আছে, যখন তার বয়স ১০/১২ বছর তখন পিতার নির্দেশে গ্রামের পার্শ্ববর্তী মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন। গরু দিয়ে ক্ষেত নষ্ট করার অভিযোগে ক্ষেতের মালিক গরু গুলো ধরতে গেলে তিনি সব গরু বক বানিয়ে বটগাছে বসিয়ে রাখেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে মামার বাড়িতে থেকে অন্যের জমিতে দিনমজুর খাটতেন। একদিন সরিষা মাড়াই করতে মাঠে গিয়ে সরিষার গাঁদায় আগুন ধরিয়ে দেন।

সংবাদ শুনে গৃহস্থ মাঠে গিয়ে দেখে সরিষার গাঁদায় আগুন জ্বলছে। তখন গৃহস্থ রাগান্বিত হলে তিনি হেঁসে ছাই উড়িয়ে দেখিয়ে দেন সরিষা পোড়েনি। একদিন তার মামি খেঁজুর রসের চুলায় জ্বাল দিতে বললে তিনি জ্বালানির পরিবর্তে চুলায় পা ঢুকিয়ে আগুনে জ্বাল দিতে থাকেন। এতেও তার পায়ের কোনো ক্ষতি হয়নি।
অলৌকিক ঘটনার জন্ম দিতে থাকলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মানুষ তার নিকট এসে শিষ্যত্ব নেন। ‘অলৌকিক ঘটনার প্রেক্ষিতে বলুহ দেওয়ান পীর আখ্যা পান।’

তার মৃত্যুর পর গ্রামাঞ্চলের মানুষ জটিল ও কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পেতে তার নামে মানত করতে থাকে। মানত পরিশোধে প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার হাজরাখানা গ্রামে অব¯ি’ত তার রওজা শরীফে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, নারকেল ও টাকাসহ নানা দ্রব্যাদি দিয়ে মানত শোধ করতে থাকে। একসময় ভক্তদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রয়োজনে গড়ে ওঠে পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) মেলা। বিগত পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে জমজমাট মেলা। প্রতি ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার মেলা শুরু হয়ে ৩ থেকে সাতদিন মেলার আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও মেলা শুরু ১৫/২০ দিন পূর্ব থেকে শেষের ১০/১২ দিন পর্যন্ত চলমান থাকে মেলার বেচাকেনা।

এ বিষয়ে নারায়নপুর ইউনিয়ন পরিষদের হাজরাখানা ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনিরুজ্জামান মিলন বলেন, প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেলা ও ঔরসের অনুমতি চেয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করা হয়। তবে করোনার কারণে শেষমেষ প্রশাসনের অনুমতি পায়নি।
মাজার কমিটির সভাপতি আশাদুল ইসলাম বলেন, ঔরস করার জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। মাজার রংচং করা হয়েছে। মাইক সাউন্ডবক্স আনা হয়েছে। বিভিন্ন ¯œান থেকে চিশতিয়া তরিকার গুরুরা এসেছেন। তবে মেলার অনুমতি না দেয়ায় আমরা একটু বেকায়দায় পড়েছি।

শেয়ার