খুললো দুয়ার, ফিরলো প্রাণ

 দেড় বছর পর স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের পদচারণা, প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস

সালমান হাসান রাজিব ও জাহিদ হাসান
সবার মুখে মাস্ক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢোকার মুখে চলছে স্যানিটাইজার স্প্রে। স্টাফদের পাশাপাশি এই কাজে যুক্ত হন স্কাউটরাও। শিক্ষার্থীদের হাতে ফুল ও চকোলেট তুলে দিচ্ছেন শিক্ষকরা। দীর্ঘ বিরতির পর স্কুলে ফিরে এভাবেই বরণ হয় শিক্ষার্থীরা। নতুন এক স্বাভাবিকতায় স্কুলে ফিরল তারা। আর তাদের পদচারণায় ক্যাম্পাস-শ্রেণিকক্ষ হলো আবারো মুখরিত।

রোববার ৫৪৩ দিন পরে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে। ফলে স্কুল-কলেজ খোলায় ‘ঘরবন্দি’ জীবনের বৃত্তমুক্ত হয়ে এদিন উচ্ছ্বাসিত ছিল তারা। সবারই চোখে ছিল খুশির ঝিলিক। তবে ছোট ক্লাসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল খানিকটা আড়ষ্টতাও। কারণ দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় সকালে ঘুম থেকে ওঠা, বিদ্যালয়ে আসাটা যেন প্রায় ভুলেই গেছে তারা।

শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে যাতে ক্লাসে সবাই বসতে পারে তার জন্য নতুন ধাঁচের সিট প্লান করা হয়েছে। অনেক স্কুলে একটি বেঞ্চে একজন মাত্র শিক্ষার্থী বসিয়েছে। এক্ষেত্রে তারা সিট প্লান করে জেড আকৃতির। তিনটি বেঞ্চের তিন কোণে তিন শিক্ষার্থীকে বসানো হয়েছে। যশোর জিলা স্কুলের ক্লাসরুমে এরকম সিট প্লানে শিক্ষার্থী বসানো হয়। অনেক স্কুলে মাঝখানে ফাঁকা রেখে এক বেঞ্চে দু’জন বসানো হয়েছে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম গোলাম আযম জানান, সবার আগে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। গাইডলাইন অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে বসাতে হবে। কোনোভাবেই এক বেঞ্চে দুজনের বেশি বসানো যাবে না। আর বেঞ্চ ছোট হলে সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র একজনকে বসাতে হবে। তিনি জানান, সরকারি নির্দেশনা মেনে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে যাতে স্কুল-শ্রেণি কক্ষ পরিচালনা হয় সেদিকে কড়া নজর রাখছেন। তিনিসহ তার দপ্তরে কর্মরতরাও এটি সরেজমিন ঘুরে দেখছেন।

গতকাল সকালে যশোর জিলা স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ক্লাস উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সুসজ্জিত করা হয় স্কুল-ক্যাম্পাস। ভাইরাস সংক্রমণরোধে হাত ধোয়া ও স্যানিটাইজ সম্পর্কিত সচেতনতামূলক পোস্টার টানানো হয়েছে শ্রেণিকক্ষসহ স্কুল ভবনের দেওয়ালে। স্কুলে আসা শিক্ষার্থীদের এদিন ফুল ও চকোলেট দিয়ে বরণ করে নেন শিক্ষকরা। স্কুল স্টাফদের পাশাপাশি স্কাউট দলের ছেলেরা অন্য শিক্ষার্থীদের হাতে স্যানিটাইজার স্প্রের করে দেয়।

স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শোয়াইব হোসেন জানান, সরকারি নির্দেশনা মেনে ক্লাসে পাঠদানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া নির্দেশিত গাইডলাইন অনুসরণ করে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের সবব্যবস্থা করেছেন। নির্দিষ্ট দূরত্বে শিক্ষার্থীদের বসানোসহ তাদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত মাস্ক ও স্যানিটাইজার এবং হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন।

জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইনান্ আন নূর জানান, স্কুল খোলা না থাকলে পড়াশোনা ঠিকমত হয় না। অনলাইন ক্লাস থেকে পাঠদানের সবকিছু সেভাবে বোঝা যায় না। এছাড়া সবার পক্ষে কোচিং ক্লাস ও বাড়িতে টিউটর রেখে পড়া সম্ভব না। তাই স্কুল খোলায় তারা উপকৃত হবে।

স্কুলটির পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তওসীফ ইসলাম সাদ’র মা নিগার সুলতানা বলেন, স্কুল বন্ধ থাকায় ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছিল। গেমস খেলায় আসক্তি বাড়ছিল শিশুদের। তিনি বলেন, স্কুল খুলে দেওয়ায় শিশুরা আবারও লেখাপড়ায় ফিরতে পারবে। শিক্ষকদের উচিত হবে পাঠদানের পাশাপাশি স্কুল চলাকালে শিক্ষার্থীরা যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে দিকে নজর রাখা।

যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজেও শিক্ষার্থীদের জন্য সুরক্ষার সব বন্দোবস্ত রাখেন কর্তৃপক্ষ। হ্যান্ড থার্মাল দিয়ে তাপ মাপা, শিক্ষার্থীদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার করারও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন বাদে ক্লাসে এসে সহজবোধ করে তার জন্য গানও বাজানো হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপা সাহা নামে এক অভিভাবকের সাথে আলাপচারিতায় জানান, স্কুল খুলে দেওয়ায় ভালো হয়েছে। দীর্ঘদিন বাদে সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পেরে তিনি খুশি। তিনি আরও জানান, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে তার মধ্যে কোনো ভীতি কাজ করছে না। স্কুলটির দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অহনা খালেক জানান, স্কুল খোলায় আনন্দিত। বাড়িতে থেকে সময় ভালো কাটছিলো না। পড়াশোনাও সেভাবে হচ্ছিল না। এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় লেখাপড়ায় ছন্দ ফিরবে।

শহরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের বরণ করা হয়। স্কুলটির ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসমিন জানান, আবারো স্কুলে আসতে পেরে তার ভালো লাগছে। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া আক্তারও তার সাথে সুর মেলায়। নুর জাহান নামে এক অভিভাবক বলেন, এতো দিন ধরে সকাল ১০ টা ১১টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকতো মেয়ে। স্কুলে যাওয়ার আনন্দে আজ সকাল ৬ টায় ঘুম থেকে উঠেছে। এটি তার কাছে আনন্দের। যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান জানান, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

 

শেয়ার