কাল খুলছে স্কুল কলেজের দ্বার

 দেড় বছর পর শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো

জাহিদ হাসান
আগামীকাল রোববার খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেড় বছরপর খুলে দেওয়ার ঘোষণায় খুশির আমেজ বইছে যশোরের ১ হাজার ৯শ’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখি করতে ইতোমধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বাস্থ্য সুরক্ষার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতের বিষয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। স্কুল আঙিনা, বারান্দা, শ্রেণিকক্ষে ঝাড় দেওয়ার পাশাপাশি করা হয়েছে চেয়ার-টেবিল পরিষ্কারের কাজ। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা যাতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে প্রবেশ করতে পারে সে জন্য তিন ফুট অন্তর দেওয়া হচ্ছে বিশেষ চিহ্ন। আর স্কুল খোলার ঘোষণায় শিক্ষার্থীসহ তাদের অভিভাবকরাও অনেক আনন্দিত। সবমিলিয়েই পরিপাটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা যেন শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার প্রহর গুনছে।

জানা গেছে, যশোরের আট উপজেলায় স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ১ হাজার ৯শ’টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লক্ষাধিক। দীর্ঘদিন পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় উপস্থিত হবে এসব শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতি নিতে সরকার যে ১৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছে, তা শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা শিক্ষা অফিস। প্রতিষ্ঠানগুলোতে শেষ হয়েছে ধোয়া-মোছার কাজ। বেঞ্চগুলো এরই মধ্যে পরিষ্কার করা হয়েছে। দূরত্ব বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় বেঞ্চ সংযোজন করা হয়েছে। প্রবেশ গেটে ‘নো মাস্ক, নো স্কুল’সহ বিভিন্ন সচেতনতা ও নির্দেশনামূলক লেখা টানানো হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জটলা ভিড় এড়াতে নির্দিষ্ট দূরত্বে বৃত্ত অঙ্কন করে দেওয়া হয়েছে। পরিপাটি স্কুল-কলেজের আঙিনা যেন শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার প্রহর গুনছে। একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাপমাত্রা মাপার জন্য থার্মোমিটার, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণও রাখা হয়েছে। তবে প্রস্তুতির কাজে শহরের চেয়ে গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা পিছিয়ে আছে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। একই সাথে অনেক শিক্ষক ও স্কুল কর্মচারী এখনও নেননি করোনার টিকা। এদিকে, দীর্ঘদিন পর স্কুলমুখি শিক্ষার্থীদের আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে ফুল কিংবা শিক্ষা উপকরণ দিয়ে বরণ করার নির্দেশনা দিয়েছে জেলা শিক্ষা অফিস। তা বাস্তবায়নেও কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা।

যশোর জিলা স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শোয়াইব হোসেন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানে ২ হাজার ৬৬ শিক্ষার্থীর জন্য ৩৫টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। সরকারি নির্দেশনার আলোকে এরই মধ্যে বেসিন স্থাপন করা হয়েছে। কোনোভাবেই গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার সুযোগ নেই। আমরা প্রতি বেঞ্চে একজন করে শিক্ষার্থী বসানোর পরিকল্পনা করছি। প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

যশোর ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজের অধ্যক্ষ জে এম ইকবাল হোসেন জানান, কলেজে অনার্স পর্যন্ত থাকলেও শুধুমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ পর্যন্ত কলেজ খুলছে রোববার। এই উপলক্ষে কলেজ ক্যাম্পাসসহ পরিষ্কার করা হয়েছে বেঞ্চগুলো। বিদ্যালয়ের আঙিনায় চলছে ধোয়া-মোছার কাজ। বিভিন্ন পয়েন্টে টানানো হচ্ছে সচেতনতা ও নির্দেশনামূলক লেখা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা হচ্ছে শিক্ষকদের প্রাণ। তাদের দূরে রেখে মোটেই ভালো ছিলেন না তারা। পরিপাটি কলেজের আঙিনা যেন শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার প্রহর গুনছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে কোন ছাড় নেই কলেজের পক্ষ থেকে। তাই কলেজে তারা তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র, শিক্ষার্থীদের জন্য মাস্ক, জীবাণুমুক্তকরণ যন্ত্র (স্প্রে মেশিন), প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী কিনেছেন। কলেজ না খুললেও অনলাইনে প্রতিটি বিভাগে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিলো বলে জানান তিনি।

যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে আমরা প্রস্তুত। সরকারের নির্দেশনা মেনেই আমরা সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখি করতে প্রতিদিন গ্রামে প্রচার-প্রচারণা ও মাইকিং করা হচ্ছে। আশা করি প্রথম দিনই শতকরা ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত হবে। কেশবপুরের হাসানপুর মুক্তিযোদ্ধা কারিগরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সুপারিনটেনডেন্ট সামছুর নাহার বলেন, করোনায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিলো। তার মধ্যে আম্পান ঝড়ে স্কুলের ছাউনি উড়ে গিয়েছিলো। কিছুদিন আগে মেরামত করেছি। ২৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৩টি ক্লাস রুম। আবার দুটি রুমের ছাউনি নেই। এর মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার নির্দেশনা এসেছে। তার মধ্যেও আমাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বরণ করার জন্য আমরা সকল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে মাস্ক প্রদান করবো। যশোর মিউনিসিপ্যাল প্রিপারেটরি স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্র তাবাচ্ছুম জানায়, দীর্ঘ দিন পর স্কুল খোলার খবরে তাদের খুব আনন্দ লাগছে। স্কুলের বন্ধুদের সাথে অনেক দিন দেখা হয়নি। আবার স্কুলে যাবো ভাবতেই খুব ভালো লাগছে। তাবাচ্ছুমের বাবা শিকদার হোসেন বলেন, বন্ধের সময় বাড়িতে ছেলেমেয়েদের তেমন লেখাপড়া হয়নি। শিক্ষাক্ষেত্রে তারা অনেক পিছিয়ে পড়েছে। অল্প সময়ে পরীক্ষার পুরো প্রস্তুতি নিতে পারবে কি-না এ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম বলেন, যশোরের এক হাজার ২৭৯টি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ইতোমধ্যে সব নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। খুলনা বিভাগে ইতোমধ্যে ক্লাস গ্রহণের জন্যে ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। যা দেখে শিক্ষকরা বাচ্চাদের কীভাবে শিক্ষা দেবেন, সেটি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবেন। বাচ্চাদের মানসিক ও শারীরিক বিষয়ের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে পঞ্চম শ্রেণির নিয়মিত এবং অন্যদের একদিন করে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিসার এ কে এম গোলাম আযম বলেন, স্কুল খুলে দেওয়ার ঘোষণার পরপরই যশোরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাজসাজ রব পড়েছে। ইতোমধ্যে ক্লাসরুম, ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। জেলায় ৫২৭টি স্কুলের প্রধানকে স্কুল পরিচালনার বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রধান শিক্ষকদের বলেছি, বাচ্চারা দীর্ঘদিন পর স্কুলমুখী হচ্ছে, তারা যেন কোন অসুবিধায় না ভোগে। সে কারণে তাদের প্রথম দিন যদি সম্ভব হয়, ফুল দিয়ে যেন স্বাগত জানানো। কয়েকটি স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে জানিয়েছে, ১২ সেপ্টেম্বর তারা শিক্ষার্থীদের ফুল দেবে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একটি করে কলম দেবে। এটি একটি দারুণ উদ্যোগ বলে মনে করছি। আর কোনও প্রতিষ্ঠান যদি ফুল-কলম বা অন্যকিছু না দিতে পারে, তবে তারা যেন বাচ্চাদের করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়। তাহলে তারা সম্মানিত বোধ করবে।

শেয়ার