যশোরের বিস্তীর্ণ মাঠ ও জলাধার জুড়ে সোনালী আঁশের কর্মযজ্ঞ

সালমান হাসান রাজিব
একাধারে চলছে কাটা, জাগ দেওয়া পাটের আঁশ ছাড়ানো ও ধুয়ে আঁটি বাঁধার কাজ। সোনালী ফসল পাট নিয়ে কর্মযজ্ঞে যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জনপদ। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে পাট ঘরে তোলার কাজে নেমেছে কৃষক। বসে নেই কৃষাণিরাও। তারাও এই কাজে কোমরবেঁধে নেমেছে। যশোরের ফসলের মাঠসহ প্রাকৃতিক জলাধার খাল, বিল, বাঁওড় ও নদীতে এমন দৃশ্য এখন সচরাচর। ফলে লকডাউনে কার্যত অচল কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে।

যশোরের বিভিন্ন ফসলের মাঠ, বিল ও বাঁওড়ের পাড় ঘুরে দেখা যায়, পাট কেটে জাগ দেয়ার জন্য পানিতে ডুবিয়ে রাখছেন কৃষক। আর যাদের জাগ দেয়ার পালা শেষ তারা পাটের আঁশ ছাড়িয়ে পানিতে ধুঁয়ে আঁটি বাঁধছে। তারপর সেগুলো পাওয়ার ট্রিলারের ট্রলিতে চাপিয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন কৃষক। আর পাটের এই আঁশ ছাড়ানোর কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও হাত লাগাচ্ছেন। অনেক নারী মজুরির ভিত্তিতে এই কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
জানা গেছে, আঁশ ছাড়ানোর পর ধুয়ে পাটের একেকটি আঁটি বাঁধা বাবদ মজুরি হলো ২০ টাকা। চাঁচড়ার হরিণার বিলে এই কাজ করার সময় আলাপচারিতায় লতিকা রানী রায় ও শেফালী মল্লিক জানান, আঁশ ছাড়িয়ে ধোয়ার পর প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ আঁটি পর্যন্ত তারা বাঁধতে পারেন। সেখানে আলাপ হয় ট্রলিচালক কবীর হোসেনের সাথে। তিনি জানান, বর্তমানে পাট ও পাটকাঠি টানার কাজ করছেন তারা। প্রতি আঁটি পাটের বহন খরচ ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত। দূরত্ব ভেদে এই দর ঠিক হয় বলে আরও জানান তিনি। তিনি বলেন, প্রতিদিন ২ থেকে ৩ বিঘা জমির পাট ও পাটকাঠি বহনের কাজ পাচ্ছেন।

কৃষক বলছেন, এবার পাটের যথেষ্ট ভাল ফলন হয়েছে। এখন বাজার দাম ঠিকঠাক মিললেই হলো। আর তেমনটি হলে লাভবান হবেন। জেলার কৃষিবিভাগ সূত্র বলছে, যশোরে এবার লক্ষ্যমাত্রারও বেশি পাটের আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে আট উপজেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, ২৫ হাজার ৩০০ হেক্টর। কিন্তু আবাদ হয়েছে তার চেয়েও বেশি। এবার মোট ২৬ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ২৩ হাজার ৫৬৫ হেক্টর। ফলে তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, লাভজনক হয়ে ওঠায় যশোরে পাটের চাষাবাদ ও উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জানা গেছে, এবার যারা আগে পাট কেটেছেন তারা অনেকেই জাগ দেয়ার পর্বটি সেরে ফেলেছেন। রোদে শুকিয়ে বাজারে বিক্রিও শুরু করেছেন। মানভেদে আগাম তোলা এসব পাট ১ হাজার ৮শ’ থেকে ২ হাজার ৭শ’ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষক ও কৃষিবিভাগ সূত্র জানায়, ধান চাষ শুরুর জন্য আগাম কাটা পাট আকারে একটু ছোট হয়। বর্তমানে এগুলো মণপ্রতি সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮শ’ দরে বিক্রি হচ্ছে। আর এখন যেসব বড় আকৃতির পাটের আঁশ উঠছে সেগুলোর দাম সর্বনিম্ন ২ হাজার ৭শ’ টাকা। সদরের চাঁচড়ার রূপদিয়া গ্রামের কৃষক আদিত্য বিশ^াস জানান, এবার আড়াই বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। বিঘা প্রতি ৮ থেকে ১০ মণ মত পাটের ফলন পাবেন বলে মনে করছেন তিনি।

কৃষক সঞ্জয় সরকার জানান, ২ বিঘা জমিতে পাট আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। যারা ইতিমধ্যে পাট বিক্রি করেছেন তাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, ছোট থাকতে কাটা পাটের মণপ্রতি দাম মিলেছে ১ হাজার ৭শ’ টাকা থেকে ১ হাজার ৮শ’ টাকা। আর এখন যেসব পাট উঠছে সেগুলোর সর্বনিম্ন দাম ২ হাজার ৪শ’ টাকা। তিনি দাবি করেন, দামের পতন না হলে মোটামুটি লাভবান হবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক চন্দ্র বিশ্বাস জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাতে লাভবান হয়েছেন যশোরের কৃষক। বিশেষ পাটের জাগ দেওয়ার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে এই বৃষ্টিপাত। জলাধারে পানি বেড়েছে। ফলে পাট জাগ দেয়া, আঁশ ছাড়িয়ে ধোয়ার কাজটি ভালোমতন করা যাচ্ছে। এতে পাটের আঁশের রং ভালো হবে। ফলে দামও ভালো মিলবে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে পাটের বাজার দর ভালো যাচ্ছে। এখন আরো ভালো পাট উঠছে। তাই দামও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

যশোরস্থ সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কার্যালয়ের জেলা বাজার কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান জানান, জেলার হাট-বাজারে ইতিমধ্যে পাট কেনাবেচা শুরু হয়েছে গেছে। বর্তমানে মানভেদে পাটের দাম ২ হাজার ২শ’ থেকে ২ হাজার ৪শ’ টাকার মধ্যে। তিনি আরও জানান, এক্ষেত্রে তোশা পাটের (স্থানীয়ভাবে যেটি সোনালী লালী নামে পরিচিত) দাম সাড়ে ২৩শ’ থেকে ২৪শ’ টাকা। আর যেসব পাটের রং ভালো হয়নি, কালচে বর্ণ ধারণ করেছে সেগুলোর দাম ২২শ’ থেকে ২৩শ’ টাকা।

শেয়ার