বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল

নাসরীন মুস্তাফা
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের বড়ো ছেলে শেখ কামাল। ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট তারিখে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কামাল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে স্বাধীনতাবিরোধী শত্রুর কাপুরুষোচিত হামলায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে প্রথম শহিদ হন তিনি। আজ তাঁর ৭৩তম জন্মদিনে গভীর বেদনার সাথে স্মরণ করছি মাত্র ছাব্বিশ বছরে থমকে যাওয়া এক চিরতরুণের অনন্য অসাধারণ জীবনকে। আজকের তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করার জন্য এই তরুণের জীবনের নানাদিক সামনে নিয়ে আসা খুব জরুরি। কেননা, বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ বলেই এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য চাই সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ, যার নাম দেশপ্রেমিক-মানবিক-মেধাসম্পন্ন-আত্মমর্যাদাশীল জনগোষ্ঠী।

১৯৭২ সালের ৪ জুলাই কুমিল্লায় এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে জাতির পিতা বলেছিলেন, “সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ পয়দা করতে হবে।” যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তোলার পাশাপাশি সোনার মানুষ তৈরির কাজ তিনি শুরু করেছিলেন। তাঁর সন্তান হিসেবে কেবল নয়, মানসিক উত্তরাধিকারী হিসেবে শেখ কামাল এগিয়ে এসেছিলেন সোনার মানুষ গড়ে তোলার নতুন সেই লড়াইয়ে। মাত্র ২৬ বছরে তাঁকে থামিয়ে না দিলে এই কাজ কতটুকু এগিয়ে যেতে পারত, তা ভাবলেই হাহাকার জমা হয় মনে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরিয়ে এনে বাংলাদেশকে দুর্নীতি, মুনাফালোভী সমাজ উপহার দিয়েছিল সুবিধাভোগী সরকারগুলো। এর ফলে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে দেশ-দেশের মানুষের স্বার্থকে এক নিমিষে জলাঞ্জলী দিতে পারা ভয়ংকর দুর্নীতিবাজ, টাকা পাচারকারী অংশ। এরা হতাশা ছড়ায়, ছড়িয়েছে এতকাল। দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে, নিজেদের ঠিকানা বিদেশেই ঠিক করেছে। দেশকে ব্যবহার করেছে মাত্র। এরকম প্রেক্ষাপটে সোনার মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টায় একালের তারুণ্য যখন করোনা মহামারীর মতো যে কোনো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মানুষের জন্য, শেখ কামাল নামের আলোকিত শুভ্রতা এই প্রজন্মকে সাহস জোগায়। তিনি তো এদের মতোই জাগ্রত ছিলেন। ছিলেন আপাদমস্তক খাঁটি দেশপ্রেমিক।

২৫শে মার্চের কালরাতে গণহত্যা শুরু করার পাশাপাশি তীব্র প্রতিহিংসাপরায়ন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর থেকে গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেফতার হওয়ার আগেই ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্তÍ সর্বাত্মক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবাইকে বন্দী করে রাখা হয় ধানমন্ডির ১৮ নম্বরের বাড়িতে। কঠোর নজরদারি এড়িয়ে কৌশলে পালিয়ে যাওয়া শেখ কামালকে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানার চাপতা বাজার থেকে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে শেখ কামাল ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট ওয়ার কোর্স’-এর কমিশন পান। ছিলেন প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর এইড ডি ক্যাম্প (এডিসি)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পদক, ভারতের পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহিরের সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সহজ শেখ কামালের অনন্য পরিচয়ের খোঁজ পেয়েছিলাম। ১৯৭১ সালে মুজিবনগরে শেখ কামালের সাথে দেখা হলে নিজের পোশাক থেকে ফতুয়া আর লুঙ্গি এনে বলেছিলেন, জহির ভাই! পরে নিন্। নিজের খাবার থেকে আরেক থালায় ভাত-ডাল-সবজি দিয়ে খেতে দিয়েছিলেন। ঘুমানোর জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন নিজের বিছানা। এতে বিব্রত হয়েছিলেন শেখ কামালের জহির ভাই। বঙ্গবন্ধুপুত্র কেনো বিছানায় শোবেন না! শেখ কামাল মৃদু হেসে বলেছিলেন, আমি আপনার মাথার উপরে থাকব। বিছানার পাশে থাকা টেবিলের উপর ঘুমিয়েছিলেন তিনি।

শেখ কামালের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, বীর মুক্তিযোদ্ধার পাশে থাকতে চান তিনি। কেননা, বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন বাজি রেখে ছুটে এসেছেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য। অসম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করছেন। প্রাণ দিচ্ছেন। শেখ কামাল এরপরও আন্তরিকতার সাথে মনে করিয়ে দেন, জহির ভাই! সাবধানে লড়বেন। বেঁচে থাকতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় হ’ল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে এসেছেন প্রিয় মাতৃভূমিতে। ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে কাজী সাজ্জাদ আলী জহির গিয়েছিলেন ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে। শেখ কামাল বাইরে ছিলেন। ফিরে এসে দেখলেন জহির ভাইকে। বঙ্গবন্ধুকে মজা করে বলেছিলেন, আমি কিন্তু জহির ভাইয়ের মাথার উপরে ছিলাম!

বন্ধুবৎসল শেখ কামাল এভাবেই আপন করে নিতেন সবাইকে, আপন হয়ে উঠতেন সবার। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের একজন সদস্য হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে ভূমিকা রাখছিলেন শেখ কামাল।

তরুণদের রাজনীতি সচেতনতার পাশাপাশি খেলার মাঠে, নাটক-সংগীতসহ সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত থাকার আহবান জানিয়ে ক্ষান্ত থাকেননি তিনি, সুযোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নিজেও সম্পৃক্ত ছিলেন এসবে। ’৬৬-তে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণার পর বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশে দানা বাঁধে বাঙালির ঐক্য। ’৬৮-তে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী বানিয়ে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্টী। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে এনে ’৭০-এর

শেয়ার