করোনায় মানবসেবায় অনন্য যশোর রেড ক্রিসেট যুব ইউনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘুর্ণিঝড়, সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন টিমের সাথে কাজ করেছে যশোর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যুব ইউনিট। এখন করোনাকালে যশোরের জেলা প্রশাসনের সহযোগী ইউনিট হিসেবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এছাড়া করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য ইউনিটের সদস্যরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে জেলা সদর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে পালাক্রমে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ শুরু করে। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন দপ্তরেও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছে যুব ইউনিট সদস্যরা। এই বিষয়ে এই ইউনিটের চিফ প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, যশোর রেড ক্রিসেন্টের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান টুকুনের নেতৃত্বে যুব ইউনিটের ৯০ জন সদস্য সার্বক্ষনিক কাজ করছে। এর মধ্যে ৩০-৩২ জন নারী কর্মীও রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে কাজ করছি। আমাদের যুব ইউনিটের অধিকাংশ সদস্যই ছাত্র। পড়াশুনার পাশাপাশি মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে আমি ৮/১০ বছর আগে যশোর রেড সিক্রেন্ট ইউনিটের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম। সেই থেকে শুরু। কোন কিছু পাওয়ার আশায় নয়, মানুষ হয়ে মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজও অব্যাহত আছে। মেহেদী হাসান বলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এই ব্রত নিয়ে আমরা যুব ইউনিট সদস্যরা সর্বদা কাজ করছি।

যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের সদুল্লাহপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক শহিদুল ইসলামের ৩ সন্তানের মধ্যে মেহেদী হাসান দ্বিতীয়। ছোট বেলা থেকেই চঞ্চল প্রকৃতির মেহেদী গ্রামের স্কুল থেকে ৮ম শ্রেণি পাশ করে। পরে যশোর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। টেকনিক্যাল লাইনে এসএসসি ভোকেশনাল পাশ করার পর একই প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার সাইন্সে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার কোর্সে ভর্তি হন। এখানে অধ্যায়নরত অবস্থায় যশোর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্যোগে জেটিএসসিতে ফ্রি ব্লাড ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। এই ফ্রি ব্লাড ক্যাম্পের এক জন ডোনার ছিলেন মেহেদী। তিনি একজন মুমুর্ষ থ্যালাসেমিয়া রোগীকে রক্ত দান করেন। এই ক্যাম্পের মাধ্যমে তিনি রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হন। পরে তিনি স্বেচ্ছায় রেড ক্রিসেন্টের হয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে রেড ক্রিসেন্ট যশোর ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান টুকুনের হাত ধরে তিনি যুব ইউনিটের সদস্য পদ লাভ করেন। ইতিমধ্যে প্রকৌশলী মেহেদী যুব ইউনিট যশোর কমিটির টিম লিডার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়; রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স টিমের একজন অন্যতম সদস্য প্রকৌশলী মেহেদী হাসান। তিনি দীর্ঘদিন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করেছেন।

এদিকে করোনা মহামারি আকার ধারণ করলে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মতো যশোর রেড ক্রিসেন্টের যুব ইউনিটের সদস্যরা স্বেচ্ছায় রাস্তায় নেমে আসে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবার প্রত্যয় নিয়ে। করোনা সচেতনতা বৃদ্ধিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহযোগী হিসেবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাক্স বিতরণ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ থেকে শুরু করে ট্রাফিক কন্ট্রোলের কাজ করে যুব ইউনিটের সদস্যরা। এছাড়া করোনা রোগীদের সেবা প্রদান, স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা, খাবার বিতরণ করা, নগদ অর্থ বিতরণ করা, অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে করোনা সংক্রমন রোধে সব ধরনের কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে যুব রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা। সর্বোপরি করোনা ভ্যাকসিন প্রদানে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিসহ ভ্যাকসিন গ্রহনে তাদের সার্বক্ষনিক সহায়তা প্রদান করছে রেড ক্রিসেন্ট যুব ইউনিটের সদস্যরা। ইউনিট চীফ প্রকৌশলী মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি টিম যশোর জেনারেল হাসপাতালে করোনা ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনায় সার্বক্ষনিক স্বাস্থ্য বিভাগকে সহায়তা করছে। যুব ইউনিটের কর্মকান্ডে সন্তোষ প্রকাশ করে যশোরের সিভিল সার্জন ডাক্তার আবু শাহীন বলেন, যশোরের স্বাস্থ্য বিভাগ যশোর রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ঋণী। তাদের কর্মীরা যেভাবে রাত দিন করোনা রোগীদের সেবা করছে তা বর্ণনাতীত। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং ইন্সটিটিউটের টিকাদান কেন্দ্রে সরেজিমন পরিদর্শনে দেখা যায়, রেড ক্রিসেন্ট যুব ইউনিটের সদস্যরা প্রবেশ মুখে টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে আগন্তক টিকা গ্রহনকারীদের হাসিমুখে অভিবাদন জানাচ্ছেন। তাদের হাতে থাকা টিকা কার্ড গুলো নিয়ে সযতেœ প্রাথমিক এন্ট্রিসহ যাবতীয় কাজ অবলীলায় সম্পন্ন করছেন। এর পর একটু সামনে দাঁড়িয়ে যুব রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা আগন্তুক টিকা গ্রহণকারীদের তথ্য প্রদান করে টিকা প্রদান কক্ষে যেতে সহায়তা করছেন। টিকা প্রদানের পর পরবর্তী টিকা গ্রহণের তারিখসহ নানাবিধ তথ্য টিকা কার্ডে লিপিবদ্ধ করে তা টিকা গ্রহণকারীদের হাতে সরবরাহ করছেন। এছাড়া টিকা গ্রহণের আগে গ্রহণকারীদের লাইনে দাঁড় করানোসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে পুলিশের পাশাপাশি যুব রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা কাজ করছেন। রোধ বৃষ্টি উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় এমন কাজের নজির খুব বেশি পাওয়া যাবে না বলে জানালেন যশোর ঈগল পরিবহনের স্বত্বাধিকারী পবিত্র কাপুড়িয়া। যশোরের রূপদিয়ার গোলাম আলী বলেন, রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা সুশৃঙ্খলভাবে সবাইকে সাহায্য ও সহযোগিতা করছে তা দেখার মতো। তিনি যুব রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্যদের প্রশংসা করেন। বারীনগরের নজরুল ইসলাম স্বস্ত্রীক করোনার টিকা দিতে এসেছেন। তার অনুভূতি হচ্ছে, ‘চমৎকার। যুব রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা খুব সহজে তাদের টিকা গ্রহণের কার্যক্রমকে সহজ করে দিচ্ছে।’ এ বিষয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাক্তার আক্তারুজ্জামান বলেন, যশোর জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং ইন্সটিটিউটে করোনা টিকাদান কার্যক্রম সার্বিক ভাবে দেখভাল করছে রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা। নার্সরা রেজিস্ট্রেশন সম্পন্নকারীদের টিকা দিচ্ছে। কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে জটিলতা, টিকা কার্ডে তারিখ ও ডোজ এন্ট্রিসহ যাবতীয় কাজ করছে রেড ক্রিসেন্টের যুব ইউনিট সদস্যরা। তাদের কর্মকান্ডে স্বাস্থ্য বিভাগ খুশি।

শেয়ার