চাঞ্চল্যকর তৃষা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামিরা খালাস
পূর্ণাঙ্গ রায় ও পর্যবেক্ষণের ‘অসঙ্গতি’ নিয়ে ক্ষুব্ধ বাদী আইনজীবীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরের চাঞ্চল্যকর শিশু তৃষা আফরিন কথা (৮) ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বাদী, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টরা বিস্মিত হয়েছেন। এই রায়ে মামলার দুই আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছে। গত ১১ জানুয়ারি’২১ যশোরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক টিএম মুসা এ রায় দেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায়ের বর্ণনা ও পর্যবেক্ষণে অনেক অসঙ্গতি থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরা। তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। সম্প্রতি এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু তৃষা আফরিন কথা শহরের খোলাডাঙ্গা এলাকার স্যালভেশন আর্মিপাড়ার ওমর আলীর বাড়ির ভাড়াটিয়া ইজিবাইকচালক তরিকুল ইসলামের মেয়ে ও কারবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলো, শহরের খোলাডাঙ্গা গাজীপাড়ার কামরুজ্জামানের ছেলে মেহেদী হাসান শক্তি এবং মৃত আব্দুল আওয়ালের ছেলে সাইফুল ইসলাম। এই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন শামীম ‘পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৩ মার্চ বিকেলে বাড়ির পাশে গির্জার মাঠে খেলতে যায় তৃষা। সন্ধ্যার পরও সে বাড়ি না ফেরায় স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি করে তাকে উদ্ধারে ব্যর্থ হয়। পরদিন তৃষার পিতা তরিকুল যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এদিন বিকেলে এলাকার জনৈক প্রফুল্ল’র বাড়ির পাশে মাটি খোড়া দেখে সকলের সন্দেহ হয়। এরপর সেখানকার মাটি সরিয়ে বস্তাবন্দি তৃষার লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ব্যাপারে নিহতের পিতা তরিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

মামলার তদন্ত সূত্রে জানা যায়, তৃষা হত্যা ও ধর্ষণে জড়িত সন্দেহে তদন্ত কর্মকর্তা যশোর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক শিহাবুর রহমান আসামি সাইফুল ইসলামকে আটক করেন। সাইফুল ইসলাম একই এলাকার আব্দুল আওয়ালের ছেলে। ওই সময় সাইফুল শিশু তৃষা হত্যা ও ধর্ষণের সাথে জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করে। এরপর এই ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন শামীমকে পুলিশ আটক করতে গেলে দুইপক্ষের মধ্যে গোলাগুলিতে শামীম নিহত হয়। শামীমকে মাদক সেবনে বাধা ও শক্তির সাথে ইজিবাইকে উঠা নিয়ে তৃষার বাবার বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তারা তৃষাকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
তদন্ত শেষে আটক আসামিদের দেয়া তথ্য ও সাক্ষীদের বক্তব্যে হত্যা ও ধর্ষণের সাথে জড়িত থাকায় মেহেদী হাসান শক্তি এবং সাইফুলসহ দু’জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন পুলিশ পরিদর্শক শিহাবুর রহমান শিহাব। আদালতে চার্জশিট প্রদানকালে অভিযুক্ত আসামি মেহেদী হাসান শক্তি গাজী পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির জন্য আদালতকে অনুরোধ করা হয়।

এছাড়া এই ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ী শামীম গত বছরের ৬ মার্চ বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার কারণে চার্জশিটে তার অব্যাহতির আবেদন করা হয়। চার্জশিট দাখিলের পর অভিযুক্ত শক্তি আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিন আবেদন করেন।

দীর্ঘদিন পর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে গত ১১ জানুয়ারি’২১ যশোরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক টিএম মুসা এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আটক আসামি মেহেদী হাসান শক্তি এবং সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন প্রমাণ না পাওয়ায় বিচারক তাদের এই মামলায় খালাস দেন। এই রায়ে তৃষার বাবা, মা, মামলার আইনজীবী এবং যশোরের বিভিন্নস্তরের মানুষ বিস্মিত, স্তম্ভিত ও অসন্তুষ্ট হয়েছে।
সম্প্রতি এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের বর্ণনায় রায় এবং পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

আইনজীবীদের মতে, মামলার ভিকটিম তৃষাকে ডেকে নিয়ে আসামি শামীমের ঘরে ধর্ষণ ও হত্যা এবং শামীমের বাড়ির পেছনে পুঁতে রাখা হয়। ফলে এই মামলার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই। কিন্তু আসামি সাইফুল ইসলামের স্বীকারোক্তি, ভিকটিমের পরিধেয় জামা ও প্যান্টের ছেড়া অংশ সাইফুলের স্বাীকারোক্তি অনুযায়ী তার ঘর থেকে উদ্ধার, লাশ উদ্ধারসহ পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও রায়ে আসামিদের খালাস দেয়া হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামি সাইফুলের রিমান্ড শেষে প্রদত্ত প্রতিবেদনে দুটি মেডিকেল টিকিট দিয়েছেন। টিকিটে ট্রমাটিক পেইন ও ফিভার (জ্বর) লেখা আছে। ফলে আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে মারপিট করে দোষ স্বীকার (১৬৪ ধারায়) করানো হয়েছে।

কিন্তু আইনজীবীদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ যথার্থ নয়। কারণ ট্রমাটিক পেইন অর্থ শারীরিক আঘাত নয়, এটা মানসিক আঘাতকে বুঝায়। তৃষার মতো একটি শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা করার কারণে আসামি সাইফুল ট্রমাটিক পেইনে ভুগছিলেন, এমন পর্যবেক্ষণ আসাই প্রাসঙ্গিক ও আইনানুগ ছিল। আর ফিভার বা জ্বর; সেটা যে শারীরিক আঘাতের কারণেই হয়েছে, এমন পর্যবেক্ষণও মোটেই আইনানুগ নয়।

আসামি সাইফুল ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, ‘সে তৃষার পায়ুপথে ধর্ষণ করে চলে যায়। তখন তৃষা অজ্ঞান অবস্থায় পড়েছিল।’ অথচ রায়ের ১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আসামি সাইফুলের স্বীকারোক্তি মতে ‘এই আসামি কর্তৃক শামীমের ঘরে ঢুকার পূর্বেই ভিকটিমের হাত পা বাঁধা ও মুখে কাপড় গুজে ধর্ষণসহ হত্যা করা হয়েছিল দেখা যায়।’ অর্থাৎ জবানবন্দিতে সাইফুল বলেছে, তৃষা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল; সাইফুলের বয়ান উদ্ধৃত করে রায়ে বলা হয়েছে, ‘ ধর্ষণসহ হত্যা করা হয়েছিল দেখা যায়’।

জব্দ তালিকা অনুযায়ী, তৃষার পরিধেয় জামা ও প্যান্টের ছেড়া অংশ আসামি সাইফুলের দেখানো মতে তার ঘর থেকে উদ্ধার এবং জব্দ তালিকা করা হয়। সাক্ষ্য আইনের ২৭ ধারা মতে এই আলামত উদ্ধার আসামির বিরুদ্ধে শতভাগ প্রমাণ বহন করে। অপর একটি জব্দ তালিকায় স্যালোয়ারের অংশ বিশেষ দ্বারা ভিকটিমের মুখ বাঁধা ছিল। আলামত সম্পর্কে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, একই আলামত অর্থাৎ ভিকটিমের পরনের কাপড় দুই জায়গা থেকে জব্দ দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো, ভিকটিমের পরনের কাপড়ের ছেঁড়া অংশ সাইফুলের ঘর থেকে এবং অপর অংশ লাশের সাথে ছিল। ফলে ওই পর্যবেক্ষণও আইনসিদ্ধ নয়।

এছাড়া আসামি সাইফুলের স্বীকারোক্তি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং সত্য বলে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিচারিক হাকিম। অথচ রায়ে স্বীকারোক্তি সত্য নয় বলে পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ আইনসিদ্ধ নয়; বরং যদি বলা হতো, প্রমাণিত হয়নি, সেটিও যুক্তিযুক্ত হতো।

এ প্রসঙ্গে যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী ফরিদুল ইসলাম বলেন, চাঞ্চল্যকর তৃষা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বেশকিছু অসঙ্গতি রয়েছে; যেগুলো আইনসিদ্ধ নয়। আসামি সাইফুলের স্বীকারোক্তি এবং সে অনুযায়ী আলামত উদ্ধার; লাশ উদ্ধারসহ পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য মামলাটিকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে। কিন্তু তারপরও রায়ে আসামিদের খালাস দেয়া হয়েছে।

মহিলা পরিষদ যশোরের লিগ্যাল এইড সেল প্রধান অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার কনা জানান, শিশু তৃষা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর। আলোচিত এ ঘটনার বিচার দাবিতে যশোরের মানুষ রাস্তায় নেমেছে, মানববন্ধন সমাবেশ করেছে; সুষ্ঠু বিচার চেয়েছে। অনেক মামলার ক্ষেত্রে চাক্ষুস সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারে; কিন্তু পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য কখনও মিথ্যা বলে না। তাই পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যকে এড়িয়ে কিভাবে আসামিরা খালাস পেলো তা বোধগম্য নয়। এটি একটি অস্বাভাবিক রায়। এতে আমরা বিস্মিত ও অবাক হয়েছি। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন তিনি।

 

শেয়ার