যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের সম্পাদক আলমগীর হত্যাকাণ্ড ॥ শীর্ষ দুই খুনি ৭ বছরেও গ্রেপ্তার হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ গেলো সাত বছরেও যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনের দুই খুনি গ্রেপ্তার হয়নি। তদন্ত শেষে চার্জশিটে অভিযুক্ত ৪০ জনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডে ‘প্রধান ভূমিকায়’ থাকা বিসমিল্লাহ ও মহিদুল পলাতক এবং ফসিয়ার ও মহব্বত আলী রয়েছে জেলহাজতে। আর পাগলা শাহীন ক্রসফায়ারে মাগুরায় খুন হয়েছে। দিনের পর দিন শুধু মামলাটির ধার্য্য দিনই পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে থমকে আছে বিচারক কাজ। আজ মরহুমের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। তার রূহের মাগফেরাত কামনায় এলাকার মসজিদে দোয়ার অনুষ্ঠান করবে পরিবার।

নিহতের স্বজনদের ভাষ্য, ওই খুনিরা প্রকাশ্যেই আছে। কেউ বাড়ি আসে। কেউ এলাকায় ঘোরে। কেউ বা পাশের উপজেলায় দোকান দিয়ে রীতিমতো ব্যবসাও করছে।

পুলিশ, এলাকাবাসী ও স্বজন সূত্র মতে, যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন মাদক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ছিলেন সরব। ফলে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাদক কারবারীসহ অপরাধিরা একত্রিত হয়ে দুনিয়া থেকেই আলমগীর হোসেনকে সরিয়ে দিতে নানা পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ২৫ মে রাত ৮টার দিকে সদর উপজেলার রাজারহাট বাজারে অবস্থানকালে ৪০/৫০ জন সন্ত্রাসী একত্রিত হয়ে অস্ত্র, গুলি ও বোমা নিয়ে অতর্কিতভাবে আলমগীরের উপর হামলা চালায়। তাকে গুলি করে ও বোমা হামলা চালিয়ে মারাত্মক আহত করে। প্রথমে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১৮ জুন তিনি মারা যান।

এই ঘটনায় মৃত্যুর আগে তার বড় ভাই আলতাফ হোসেন বাদী হয়ে ২৯ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক অজ্ঞাতনামা আরো ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। প্রথমে থানা এবং পরে ডিবি পুলিশ মামলাটি তদন্ত শেষে ৪০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে জড়িত এমন কিছু আসামির নাম চার্জশিটে না আসায় বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করেছিলেন। শুনানি শেষে নারাজি আবেদন খারিজ করে অভিযুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন আদালত। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান চার আসামি রফিকুল ইসলাম বিসমিল্লাহ, মহব্বত আলী, ফসিয়ার গাজী ও মহিদুল ইসলাম পলাতক ছিলেন। এর মধ্যে ফসিয়ার ও মহব্বত আলী বর্তমানে জেলহাজতে আটক রয়েছে। আর রফিকুল ইসলাম বিসমিল্লাহ এবং মহিদুল ইসলাম রয়েছে এখনো পলাতক। ফলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামিরা আটক না হওয়ায় আর আইনি প্রক্রিয়া এগোয়নি।

হত্যার শিকার আলমগীর হোসেনের পরিবারের অভিযোগ খুনিরা এলাকায় রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে তাদের গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ। ফলে ৭টি বছর এভাবেই চলছে। তাই বিচার পাওয়া নিয়েও সংশয়ে রয়েছে আলমগীরের পরিবার।

সূত্র মতে, এ মামলায় আটক আসামিদের মধ্যে কয়েকজন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। আসামিদের জবানবন্দির ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা ৪০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। আর চার্জশিট দাখিলের পর ও তারা প্রকাশ্যেই এলাকার আশপাশেই ঘোরাফেরা করছে। আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলার সীমানার কাছেই মণিরামপুর উপজেলার কালারহাটে বসবাস করতেন পাগলা শাহিন। মাগুরা জেলা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম বিসমিল্লাহ কেশবপুরে বসবাস করছেন। তিনিসহ সেখানে আলমগীর হত্যার সাথে জড়িত পলাতক মহিদুল ইসলাম একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। ফলে থেমে আছে মামলার বিচার কার্যক্রম। একের পর এক দিন ধার্য্য হলেও মামলার চার্জ গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণে বিচার কাজ দিনের পর দিন বিলম্বিত হচ্ছে।

মামলার বাদী নিহতের ভাই আলতাফ হোসেন বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার না করায় আটকে আছে যশোরের আলোচিত যুবলীগ নেতা আলমগীর হত্যা মামলার চার্জ গঠন। ২০১৪ সালে জনপ্রিয় এই নেতা হত্যাকাণ্ডের পরের বছরই তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। কিন্তু মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় আর আইনি প্রক্রিয়া এগোয়নি। নিহত আলমগীর হোসেনের স্ত্রী ও রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজনীন নাহার আলমগীর বলেছেন, আইনের চোখে প্রধান দুই আসামি পলাতক থাকলেও তারা প্রকাশ্যে রয়েছে। ওই খুনিদের আটকের পর বিচারের কাঁঠগড়ায় দাঁড় করাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন তিনি।

তিনি আরো জানিয়েছেন, আজ শুক্রবার মরহুমের রূহের মাগফেরাত কামনায় এলাকার মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এই মামলায় চার্জশিটে অভিযুক্ত আসামিরা হলো, রামনগর গ্রামের বাসিন্দা রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান, শাহিন ওরফে পাগলা শাহিন, মহব্বত আলী, রফিকুল ইসলাম ওরফে বিসমিল্লাহ, অ্যাডভোকেট টিএম ওমর ফারুক, রামনগর পুকুরকুল এলাকার সুমন হোসেন ওরফে পাটালি সুমন, মানিক, রাকিব, রামনগর ধোপাপাড়ার আকাশ, একই এলাকার খাঁ-পাড়ার নাজমুল ইসলাম, মুরাদ, আহাদ, আফজাল, ওমর আলী, কাজীপুর গ্রামের ফসিয়ার রহমান গাজী, শফিক ওরফে শফিকুল, তরিকুল ইসলাম ও তফিকুল ইসলাম, সিদ্দিক, মুরাদ হোসেন ও ফরহাদ হোসেন, মহিদুল ইসলাম, আব্দুল জলিল ও তার দুই ছেলে আলম এবং আলিম, আব্দুল জব্বার খান, মফিজ, জিয়াউর রহমান, সুজন হাসান, শেখ রাসেল ইসলাম, ইয়াছিন আরাফাত ও শরফত হোসেন, আব্দুল গফুর, আকরামুল ইসলাম, শওকত হোসেন, শরিফুল ইসলাম মিন্টু, মিলন হোসেন, মুড়োলি খা’পাড়ার বিল্লাল হোসেন এবং মোশারেফ হোসেন।

শেয়ার