কোভিড লটারি: টিকা নিলে পুরস্কার মুরগি-গরু-অ্যাপার্টমেন্ট

সমাজের কথা ডেস্ক॥ থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং হংকংয়ে বাসিন্দাদের কোভিড-১৯ এর টিকা নিতে উৎসাহিত করতে নেওয়া হয়েছে অভিনব পন্থা।আয়োজন করা হয়েছে কোভিড লটারির। জিতলে পুরস্কার মুরগি, গরু, বেতনসহ ছুটি, এমনকি ১০ লাখ ডলারের অ্যাপার্টমেন্ট পর্যন্ত!

গত কয়েক সপ্তাহে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের অধিক সংক্রামক ধরনগুলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। যার বিস্তার রোধে দেশগুলোর সরকার দ্রুত নাগরিকদের টিকার আওতায় আনতে চাইছে। আর এজন্যই টিকা নিয়ে ‘লাকি ড্রয়ের’ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

থাইল্যান্ডের উত্তরের চিয়াং মাই নগরীর মায়ে চেম জেলার বেশিরভাগ বাসিন্দা গবাদি পশু পালনের কাজ করেন। তাদের টিকাদানে উৎসাহিত করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এ মাস থেকে লটারিতে পুরস্কার হিসেবে একটি গরু রেখেছেন। স্থানীয়দের মধ্যে এই উদ্যোগ বেশ সাড়া ফেলেছে।

টিকা নেওয়ার পর ৬৫ বছরের ইনখাম থংখাম পুরস্কার হিসেবে এক বছর বয়সের একটি গাভী পেয়েছেন, যেটির বাজার মূল্য ১০ হাজার বাথ। তিনি বলেন, ‘‘এটা এখন পর্যন্ত আমার পাওয়া সেরা উপহার।”

এ উদ্যোগের এখন দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে; পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে আরো ২৭টি গরু। কর্তৃপক্ষ বলেন, পাহাড়ী এ জেলার ১,৪০০ বাসিন্দার অর্ধেকের বেশি এই উদ্যোগে সাড়া দিয়েছেন। অনেক বয়স্ক এবং উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা লোকজন এরইমধ্যে টিকা গ্রহণের জন্য নাম নিবন্ধন করিয়েছেন।

থাইল্যান্ডে ছয় কোটি ৬০ লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র সাড়ে ৪৭ লাখ মানুষ কোভিড-১৯ টিকার অন্তত একটি ডোজ গ্রহণ করেছেন।

এশিয়ার অনেক দেশেই লোকজন কোভিড-১৯ এর টিকা গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করছেন। টিকা নিয়ে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়া, টিকার নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা, কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ এবং ধর্মীয় কারণ এ পেছনে দায়ী।

চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হংকং এখন পর্যন্ত মহামারীর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সেখানে টিকা গ্রহণের হার এখনও অনেক কম, যা নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ উদ্বেগে রয়েছে। কারণ, যে কোনও মুহূর্তে সেখানে ভাইরাসের ভায়াবহ বিস্তার দেখা দিতে পারে।

টিকা গ্রহণে উৎসাহ দিতে সেখানে ‘লাকি ড্র’র ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরস্কার হিসেবে রাখা হয়েছে শপিং ভাউচার, বিমানের ফ্রি টিকেট এমনকি ১৪ লাখ মার্কিন ডলার সমমূল্যের একটি নতুন অ্যাপার্টমেন্ট।

কিছু কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজেদের মত করে উদ্যোগ নিয়েছে। তারা কর্মীদের টিকা দানে উৎসাহিত করতে বেতনসহ ছুটির প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে সেখানে একটি প্রাইভেট স্পোর্টস ক্লাব পুরো উল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তারা পুরস্কারের বদলে নিয়েছে শাস্তির ব্যবস্থা। ক্লাব কর্তৃপক্ষ জুন মাসের মধ্যে কর্মীদের টিকা নিয়ে ফেলতে বলেছে। নতুবা ভবিষ্যতে তাদের বোনাস, পদন্নোতি ও বেতন বাড়ানো হবে না।

এশিয়ার আরেক দেশ ইন্দোনেশিয়ায় করোনাভাইরাস মহামারীর আঘাত বেশ জোরেশোরেই লেগেছে। তারপরও সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে টিকা গ্রহণে তেমন একটা আগ্রহ নেই।

ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি হিসাব মতে প্রায় ২০ লাখ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৫৩ হাজার ২৮০ জন। সম্প্রতি এক গবেষণায় নাগরিকদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেছে সরকারি হিসাবের চাইতে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ গুণ বেশি।

ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভার বাসিন্দা ৬৭ বছরের আসেপ সায়েপউদ্দিন বলেন, ‘‘আমি খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম, ভেবেছিলাম যদি টিকা নেই তবে আমি হয়ত সঙ্গে সঙ্গে মরে যাব.. তারপর আরও বড় দুশ্চিন্তার খবর পেলাম। শুনলাম ওইসব টিকা নাকি শুকরে থেকে তৈরি।”

বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলমান অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ৮৫ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম। টিকা নিয়ে তাদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ, টিকা হালাল কিনা এবং ইসলাম এই টিকা গ্রহণের অনুমতি দেয় কিনা।

জাভার সিপানাস কর্তৃপক্ষ জানান, বিশেষ করে বয়স্কদের কোভিড টিকা হালাল এবং নিরাপদ এটা বোঝাতে প্রচ- বেগ পেতে হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৮৮ লাখ মানুষকে টিকার আওতায় আনা গেছে। যা দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ দেশটির সরকার এক বছরের শেষ নাগাদ ১৮ কোটি ১৫ লাখ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।

থাইল্যান্ডে টিকা গ্রহণ করলে খাবার দেওয়া হচ্ছে। সেখানে প্রত্যেক বয়স্ক ব্যক্তি টিকার একটি ডোজ নেওয়ার পর উপহার হিসেবে একটি জীবন্ত মুরগি পাচ্ছেন।

স্থানীয় একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘‘নানা কারণে বয়স্ক ব্যক্তিরা টিকা নিতে চাইছেন না। কেউ কেউ বলছে তারা টিকা নিতে চান, কিন্তু টিকাদান কেন্দ্রে যেতে চান না। কেউ কেউ ভয়েও টিকা নিতে চাইছেন না।

“তাই আমরা তাদের টিকা দেওয়ার পর পুরস্কার হিসেবে মুরগি দিচ্ছি।”

 

 

শেয়ার