যশোরে বিধিনিষেধ মানতে মানুষের অনীহা, সংক্রমণ ।। না কমলে আরো কঠোর হবে প্রশাসন

জাহিদ হাসান
যশোর শহরের মোড়ে মোড়ে পুলিশের চেকপোস্ট। শহরজুড়ে পুলিশের টহল। আছে ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িবহরও। এসব দেখে বোঝা যায় করোনা সংক্রমণ কমিয়ে আনতে প্রশাসনিক তৎপরতা। কিন্তু তারপরও যশোরে পূর্ণাঙ্গভাবে পালিত হচ্ছে না কঠোর বিধিনিষেধ। প্রশাসন পুরোদমে মাঠে থাকলেও মানুষকে মানানো যাচ্ছে না বিধিনিষেধ। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনেও নানা অজুহাতে মানুষ তার গন্তব্যে পাড়ি দিয়েছেন। এদিকে, যশোর বেনাপোল রোডে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় সকল যাত্রীবাহী যানবাহন বন্ধ করেছে প্রশাসন। চলমান করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত লকডাউন না মানায় যশোর শহর ও উপজেলা পর্যায়ে ৩৮টি মামলায় ৩২ হাজার ৭শ’ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া অকারণে রাস্তায় বের হওয়ায় বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়েছে প্রায় ৫ শতাধিক ব্যক্তি ও পথচারীকে। এমন তৎপরতায়ও যদি করোনা সংক্রমণের হার না কমে সেক্ষেত্রে আরও কঠোরতা আরোপের পথে হাঁটবে প্রশাসন; এমনই বার্তা সংশ্লিষ্টদের।

জানা যায়, যশোরে অব্যাহত আছে করোনা শনাক্তের ঊর্ধ্বগতি। গত ২৪ ঘন্টায় ৭৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শুক্রবার শনাক্তের হার ছিল ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৭৪ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এদিকে করোনা সংক্রমণ রোধে যশোর পৌরসভা ও নওয়াপাড়া পৌরসভায় লকডাউন কার্যকর করা হলেও মানুষের অকারণে বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা রোধ সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধিও মানছেন না সাধারণ মানুষ। গত ১৫দিন ধরে যশোরের করোনা শনাক্তের হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। করোনা সংক্রমণ বাড়ায় ১০ জুন থেকে যশোর পৌরসভা ও নওয়াপাড়া পৌরসভায় লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। বিপনিবিতান, মার্কেট, দোকানপাট, পার্ক বন্ধ থাকলেও শহরে মানুষের চলাচল সীমিত হয়নি। প্রথমদিন থেকেই মানুষ প্রয়োজনের অজুহাতে ঘরের বাইরে আসছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করার পাশাপাশি পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েও পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সেইসাথে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি পালনের যে নির্দেশনা তাও উপেক্ষা করছেন অনেকে। তাদের দাবি, প্রয়োজন থাকায় তারা বাইরে আসছেন। তবে আগের তুলনায় মানুষ এখন কিছুটা সচেতন। প্রশাসন আরেকটু কঠোর হলে লকডাউন কার্যকরের পাশাপাশি করোনা সংক্রমণের হারও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

গতকাল সরেজমিনে শহরের দড়াটানা, মণিহার, নিউ মার্কেট মোড়, চৌরাস্তা ঘুরে দেখা যায়, সড়কের মাঝখানে ব্যারিকেট দিয়ে গাড়ি ও মোটরসাইকেল চেক করা হচ্ছে। বিভিন্ন সড়কে রিক্সা ও মোটরসাইকেলে একজনের বেশি থাকলে পুলিশ চেকপোস্ট থেকে নামিয়ে দিচ্ছে। তবে, চেকপোস্ট পার হয়েই আবার রিক্সা বা মোটরসাইকেলে দুই বা তিনজন চড়ে বসছে। অপ্রয়োজনে বের হওয়া লোকজনকে ঘরে ফেরাতে রাস্তায় ছিলেন ট্রাফিক পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এদিকে শহরসহ বড়বাজার ও আর এন রোডস্থ এলাকায় বিধিনিষেধের আওতায় বন্ধ ছিলো দোকানপাট। এছাড়া যশোর শহরের আর এন রোড, ব্যাটারিপট্টি, বড়বাজারসহ বিভিন্ন মার্কেট, পাড়ামহল্লায় বাড়ি সংলগ্ন বিভিন্ন দোকানপাটে অভিযান পরিচালনা করেছে জেলা প্রশাসনের মোবাইল টিম।

যশোর শহরের দড়াটানায় দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জন খাইরুল আলম জানান, গত ২ দিনে বিধিনিষেধ অমান্যকারী শতাধিক জনকে অর্থদণ্ডসহ মামলা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সড়কে নেমেছে র‌্যাব, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকও। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে লোকজন ও যান চলাচল ঠেকাতে পুলিশের তল্লাশি চৌকি কাজ করছে। রিকসা ও মোটরসাইকেল চালকদের এতো নিষেধ করার পরও তারা কথা শোনে না। স্বাস্থ্যবিধি মানছে না।

এদিকে জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলে জানানো হয়েছে, যশোর পৌর শহরের প্রবেশ মুখে পুলিশ ব্যারিকেট বসিয়ে যান চলাচল ও লোক সমাগম নিয়ন্ত্রণ করছেন। তবে শহরের দোকানপাট বন্ধ থাকলেও রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল চোখে পড়ার মত। প্রশাসনের আরোপিত ১২ দফা বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে দিনব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি র‌্যাব ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সদস্যরা দায়িত্বপালন করেছেন। পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দিনভর পুলিশের মোবাইল টিমে টহল অব্যাহত ছিল। আরোপিত বিধিনিষেধ অমান্যকারীদের আইনগত ব্যবস্থা নিতে যশোর সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুজ্জামান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকির হোসেনসহ জেলা প্রশাসনের পাঁচজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। তারা মণিহার, নিউ মার্কেট মোড়, ঘোপ সেন্ট্রাল মোড়, শংকরপুর টার্মিনাল, দড়াটানা মোড়, থানার মোড়, চাঁচড়া মোড় ও আরবপুরে মোড়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মোট ২৪ টি মামলায় ২৩ হাজার পাঁচশত টাকা জরিমানা করা হয়। যশোর সদর পৌর এলাকার মতো অভয়নগরের নওয়াপাড়া পৌর এলাকায় জেলা প্রশাসনের আরোপিত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমিনুর রহমান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) নারায়ণ চন্দ্র পাল মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১১ জনকে ৬ হাজার ৬শ’ টাকা জরিমানা করে। এছাড়া শার্শার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা বেনাপোল বাজার ও ছোট আঁচড়া এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এসময় তিনি তিনটি মামলায় ৬শ’ টাকা জরিমানা আদায় করেন।

যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মো. সায়েমুজ্জামান জানান, করোনা নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে প্রশাসন। দুই একদিনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসলে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি জরুরি সভা ডেকে আরো কঠোরতা আরোপের নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

শেয়ার