এক বন্ধুর প্রেমিকার সাথে ছবি ও অন্য বন্ধুর প্রেমের কথা ফাঁসের জের
দু’বন্ধু মিলে খুন করে যশোরের কলেজছাত্র পল্লবকে, অচিরেই চার্জশিট

লাবুয়াল হক রিপন
বন্ধুর প্রেমিকার সাথে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণই কাল হলো কলেজছাত্র পল্লব দত্ত ওরফে শ্রাবনের। এছাড়া আরেক বন্ধুর প্রেমের কথা পরিবারের কাছে ফাঁস করায় দুই বন্ধু মিলে তাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করে। এই হত্যাকাণ্ডে তার দুই বন্ধু ও এক বন্ধুর নানীসহ তিনজন জড়িত বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ফলে অচিরেই আলোচিত এই হত্যা মামলার পৃথক দুইটি চার্জশিট দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
বাবা বিকাশ চন্দ্র দত্ত ও মা স্বপ্না রানী দত্তকে নিয়ে যশোর সদর উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে নানা বাড়িতেই বসবাস করতেন কলেজছাত্র পল্লব দত্ত ওরফে শ্রাবন। ফরিদপুরের সালথা উপজেলার সাধুহাটি উজিরপুরে তাদের গ্রামের বাড়ি। অল্প কিছু দিন হলো বর্তমান ঠিকানায় তাদের বসবাস। যশোর সরকারি সিটি কলেজে প্রথম বর্ষে লেখাপড়া করার সুবাধে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় জগন্নাথপুর গ্রামের ফারুকের ছেলে মারুফ ওরফে ইশানের। এছাড়াও জঙ্গলবাঁধাল গ্রামের জামাল উদ্দিনের ছেলে আলিফ আহম্মেদ অপূর্বের সাথেও তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বন্ধু মারুফ ইশান ঘুনি গ্রামের মুক্তা পারভীন নামে এক তরুণীর সাথে আর আলিফ মৌমিতা আফরোজ অথৈ নামে আরেক তরুণীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। ২০১৯ সালের প্রথম সপ্তাহের দিকে মারুফ ইশান তার বান্ধবী মুক্তাকে নিয়ে আলিফের নানা বাড়িতে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। বিষয়টি পল্লব দত্ত মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে। তবে ভিডিও ধারণের সময় আলিফও সহযোগিতায় ছিল। পল্লব দু’দিন পরে মারুফ ইশানকে ওই ভিডিও’র বিষয়টি জানায়। ফলে মারুফ ইশান ভিডিওটি ডিলিট অথবা ফেরত চায়। কিন্তু কোনোমতেই ফেরত অথবা ডিলিট করতে রাজি নয় পল্লব।

এর কয়েকদিন আগে মৌমিতা আফরোজ অথৈ নামে বসুন্দিয়া গ্রামের আরেক তরুণীর সাথে আলিফের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি পল্লব তার পরিবারকে জানিয়ে দেয়। ফলে পারিবারিক চাপের মধ্যে পড়ে আলিফ।
এই দু’টি বিষয় নিয়ে পল্লবের সাথে আলিফ ও ইশানের মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। ফলে পল্লবকে খুন করতে পরিকল্পনা করে আলিফ ও ইশান।

ঘটনার দিন ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টা। প্রতিদিনের মত পল্লব নানাবাড়ি থেকে কলেজে যাওয়ার কথা বলে বের হয়। সন্ধ্যা অবধি বাড়িতে না ফেরায় আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্নস্থানে পল্লবের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপরও তার পরিবার বিভিন্নস্থানে খোঁজখবর নিয়ে না পেয়ে পল্লবের পিতা বিকাশ চন্দ্র দত্ত ২২ অক্টোবর কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। ১৭দিন পরে ৯ নভেম্বর দুপুরে সাধারণ ডায়েরির প্রেক্ষিতে পুলিশ আলিফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। এসময় আলিফের নানাবাড়িতে তার বিছানার নিচ থেকে পল্লবের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। আর ওই সময় পল্লবকে হত্যা কাজে আলিফের সাথে ইশানও ছিল বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করে। পুলিশ ইশানকে আটক করে। পরে তাদের দুইজনের দেখানো মতে আলিফের নানাবাড়ির ঘরের মধ্যে মাটি খুঁড়ে পল্লবের লাশ উদ্ধার করা হয়।

উল্লেখ্য, আলিফের পিতার সাথে তার মায়ের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় তিনি ঢাকায় থাকেন। কিন্তু আলিফ জঙ্গলবাঁধাল গ্রামে নানা আজিজুর রহমানের বাড়িতেই থাকতো। ফলে এই হত্যাকাণ্ডে আলিফের নানী সাদিয়া সুলতানা ওরফে সাফিয়া সুলতানাকেও পুলিশ আটক করে। পরে এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আটক আলিফ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে পল্লবকে হত্যার কারণ উল্লেখ করা হয়। আর এই হত্যার ঘটনাটি আড়াল করতে বা লাশ গুম করে রাখতে আলিফের নানী সহযোগিতা করেছেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। মামলাটি একেক করে চারজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে।

সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা বসুন্দিয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই জাকির হোসেন বলেছেন, তদন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। হত্যা মামলায় নারী ঘটিত ঘটনার জেরে হয়েছে বলে তদন্তে পাওয়া গেছে। এছাড়া এই মামলার ময়না তদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলও পাওয়া গেছে।

শেয়ার