যশোরের মাঠজুড়ে দোল খাচ্ছে পাকা বোরো ধান
করোনার মধ্যে ফসলের মাঠে ‘ধানযুদ্ধ’

সালমান হাসান রাজিব
বোরো ধান কেটে ঘরে তুলছেন যশোরের চাষিরা। তাই বিস্তৃত মাঠজুড়ে চলছে ফসল তোলার কর্মযজ্ঞ। ফলে আবারও শুরু হলো চাষিদের ‘ধানযুদ্ধ’। এমনকি এর ভেতর দিয়ে অচলাবস্থার মধ্যেও সচল হলো গ্রামীণ অর্থনীতিও। কারণ বর্তমানে ধান কাটা, আঁটি বাঁধা, বহন ও মাড়াই-ঝাড়াইয়ের কাজে ভালো দামের মজুরি মিলছে। আর ধানকৃষি ঘিরে চলমান এই কর্মকাণ্ড লকডাউনে বেকার শ্রমজীবীদের আয়ের সংস্থানও করছে।
এদিকে, ফলন ভালো হলেও আবাদ ব্যয় বেশি পড়ায় ধানের দাম নিয়ে চিন্তিত চাষি। ব্যয়বহুল আবাদের কারণে ‘ধানযুদ্ধে’ পরাস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। উৎপাদন খরচ উঠলেও লাভ হবে কিনা সেটি নিয়ে তারা শঙ্কিত। চাষিরা বলছেন, চলতি বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনে বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ১৭ হাজার টাকারও বেশি। আর করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতির মধ্যে দামের পতন ঘটার আশঙ্কা করছেন। আর এমনটি হলে তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন। ধানের দাম যদি এবার মণ প্রতি ১ হাজার টাকার কম ধার্য করা হয় তাহলে দুর্গতির শেষ থাকবে না তাদের।

জানা গেছে, পাকা ধান চারটি ধাপে ঘরে উঠে কৃষকের। এতে চাষিদের মোটা অংকের টাকা গুণতে হয়। এমনকি এর আগেও জমি লিজের দামসহ অন্যান্য খাতে অর্থ বিনিয়োগ করেন। যার মধ্যে যুক্ত আছে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচসহ আরো অন্যান্য খরচ।

যশোর সদরের চাঁচড়ার হরিণার বিলে ৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন কৃষক অরুন কুমার গাইন। আলাপচারিতায় জানান, ধান বিক্রির পর অনেক সময় উৎপাদন খরচও ওঠে না। দেখা যায়, বিঘা প্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা লোকসান হয়। তার ভাষ্য মতে, ধানচাষ এখন লোকসান নির্ভর। ‘বিচালি’তে (খড়) আবাদের লাভ তুলতে হয়। কারণ একবিঘা ধান আবাদে খরচ হয় ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে বিঘায় ফলন হয় ২০ থেকে ২২ মণ ধান। ফলে ধানের দাম মণ প্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় নেমে আসলে কোনো লাভ হয় না। বিচালি বিক্রি করে তখন লাভ তুলতে হয়।

চাষিরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে বিচালির দাম ভালো মিলছে। আর এটি বিক্রির টাকা থেকে লোকসান পুষিয়ে নিচ্ছেন। কারণ এক বিঘা জমির ধান থেকে দুই কাউন মতন বিচালি পাওয়া যায়। আর একেক কাউন বিচালির দাম ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। জানা গেছে, গবাদি পশু পালনের হার বেড়ে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে বিচালির চাহিদা অনেক বেড়েছে। যার কারণে দামও ভাল মিলছে। আর এটি বিক্রি করে কৃষক লোকসানের হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছেন।

চাষিদের কাছ থেকে পাওয়া এবারের বোরো মৌসুমে ধান আবাদে তাদের খাতওয়ারি খরচ : জমি চাষ (৪বার প্রতি চাষে ২৫০ টাকা করে ১ হাজার টাকা। মই দেওয়া দুইবার ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। ধানের চারার দাম সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা। চারা রোপণে খরচ দেড় হাজার টাকা এবং নিড়ানি খরচ ১৬ শ’ টাকা। এছাড়া জলসেচ ২৫শ’ টাকা, সার ও কীটনাশক খাতে ৩৫ শ’ টাকা, ধান কাটা দেড় হাজার টাকা, আঁটি বাঁধায় ১৫ শ’ টাকা, ধান বহনে ৮শ’ থেকে ১ হাজার এবং মাড়াই ও ঝাড়াই বাবদ খরচ ১৫শ’ টাকা। জমি লিজের খরচ (এক আবাদ মৌসুম) ৮ হাজার টাকা।

কৃষকরা জানান, ব্যয় এক্ষেত্রে সবসময় একরকম হয় না। এটি মূলত নির্ভর করে সার, বীজ, কীটনাশকসহ উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের দামের উপর। তাদের দাবি, এবার সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বেশি পড়ায় আবাদ খরচ অনেক বেশি হয়েছে। এছাড়া যারা স্যালোমেশিনে ধানক্ষেতে পানি দিয়েছেন তাদের সেচ খরচ অনেক বেশি পড়েছে।

সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তার যশোর কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যও বলছে, জেলায় বিঘা প্রতি ধান চাষে এবার ১৭ হাজার ২৯৫ টাকা খরচ হয়েছে। অর্থাৎ ধান আবাদ যে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে সরকারি তথ্যেও তার প্রমাণ মিলছে। জেলা বাজার কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান জানান, যশোরে বোরো ধান চাষিদের আবাদ খরচ নির্ণয় করে ইতিমধ্যে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সারা দেশে চাষিদের ধান আবাদের উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করে বিক্রির দাম নির্ধারণ করবে।

যশোরের ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, চলছে ধান কাটা ও আঁটি বাঁধা। বয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়া। সেইসাথে মাড়াই ও ঝাড়াই। বৈশাখের তপ্ত রোদে ঘামঝরানো পরিশ্রমে কৃষক ও ক্ষেত মজুররা এই কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন। দূর মাঠ থেকে ‘বাক’ কাঁধে করে ধান বয়ে আনছেন তারা। আর সেই দৃশ্য যেন রীতিমতো এক যুদ্ধের মতন। চাষিদের ভাষ্য, ধান আবাদে পারিবারিক শ্রমের বিষয়টি অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু। ধানের কাজে পারিবারিক শ্রমের ব্যাপারটি এখন এক প্রকার উঠেই গেছে। ফলে ধান চাষাবাদ পুরোপুরি কৃষি শ্রমিক নির্ভর হয়ে পড়ায় লাভের অংক শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এছাড়া ধানের বেচাবিক্রিও হচ্ছে একরকম যুদ্ধের মতন। চাষিদের দাবি, সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে ঘুষ গুণতে হয়। দিতে না পারলে আদ্রতা কম, চিটা বেশি নানান অজুহাত। ফলে ফসলটির আবাদ হয়ে উঠেছে যেন যুদ্ধের মতন; আর এর ন্যায্য দামের বঞ্চনা মানে যুদ্ধে পরাজিত।

যশোর সদরের চাঁচড়ার রূপদিয়ার কৃষক সঞ্জয় সরকার এবার নিজের ১১ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন। আলাপচারিতায় জানান, একটা সময় ছিল ধান চাষ ছিল গ্রামীণ জীবনের আনন্দের অংশ। তার বাবার সময় তিনিসহ সব ভাই মিলে ধান আবাদে হাত লাগাতেন। ফলে শ্রমিকেরও দরকার কম হতো। কিন্তু তিনি ছাড়া তার বাড়ির কেউ এখন ধানের কাজে আসতে চায় না। যার কারণে ধান উৎপাদন হয়ে পড়েছে কৃষি শ্রমিক নির্ভর। আর এরজন্য লাভও কমে গেছে। তিনি দাবি করেন, তার দুই ছেলে কলেজে লেখাপড়া করে। তারা যদি তার সাথে সহযোগিতা করতো তাহলে প্রতি মৌসুমে ধান আবাদে লাভবান হতেন।

মণিরামপুরের রোহিতার ধানচাষি আবুল কালাম বলেন, ‘তিনি ছাড়া বাড়ির কেউ এখন আর ধানের কাজে হাত লাগাতে চান না। ফলে আবাদের সব পর্যায়ে তাদের এখন কৃষি শ্রমিকের উপর নির্ভর করতে হয়। এতে ধানের আবাদ করে এখন আর লাভ হচ্ছে না। তবে যারা এখনও ধানচাষে পারিবারিক শ্রমকে কাজে লাগাচ্ছেন তারা লাভবান হচ্ছেন’-বলেন তিনি।

শেয়ার