সুপার লিগে রিয়াল-বার্সাসহ ১২ ক্লাব, ফুটবল বিশ্বে ঝড়

সমাজের কথা ডেস্ক॥ নানা গুঞ্জন, সম্ভাবনা-শঙ্কা, সবকিছুকে সত্যি প্রমাণ করে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসে গেল। রোববার রাতে ইউরোপের ১২টি ক্লাব বিবৃতি দিয়ে জানায়, প্রস্তাবিত এই লিগে তারা যোগ দিতে যাচ্ছে। ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে তিক্ত এক লড়াইয়ের সূচনা বলে মনে করা হচ্ছে এটিকে।

এই সুপার লিগের জন্য স্পেন থেকে যোগ দিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও আতলেতিকো মাদ্রিদ, ইংল্যান্ড থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, আর্সেনাল, চেলসি ও টটেনহ্যাম হটস্পার এবং ইতালি থেকে ইউভেন্তুস, এসি মিলান ও ইন্টার মিলান।

প্রাথমিকভাবে, ২৩ বছরের জন্য হয়েছে এই চুক্তি। সুপার লিগের প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেস।

জার্মানি ও ফ্রান্সের কোনো ক্লাবের যোগ দেওয়ার খবর এখনও পাওয়া যায়নি। তবে এই ১২ ক্লাবের সঙ্গে আরও তিনটি ক্লাব শিগগিরই যোগ দেবে বলে জানিয়েছে সুপার লিগ কতৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠাকালীন এই ১৫ ক্লাবের সঙ্গে প্রতি বছর কোয়ালিফাই করে আসা ৫ ক্লাব, মোট ২০ দল নিয়ে হবে এই টুর্নামেন্ট।

সুপার লিগ কতৃপক্ষ বলছে, ভবিষ্যতে উয়েফা ও ফিফার সঙ্গে আলোচনা করে কাজ করতে চায় তারা।

তবে উয়েফা আগেই কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, এই লিগে খেললে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হবে ওই ক্লাবগুলিকে। লিগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরও ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থাটি জানিযেছে, তারা এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে। এটিকে অসমর্থনের কথা জানিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ফিফা।

এমনকি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এই লিগের বিরোধিতা করে ও উয়েফার অবস্থানকে সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছেন।

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বিকল্প হিসেবে এই লিগের কথা শোনা যাচ্ছিল অনেক বছর ধরেই। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলে উয়েফার কাছ থেকে যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে, এর চেয়ে বেশি অর্থ বড় ক্লাবগুলি প্রাপ্য বলে তাদের দাবি অনেক দিনের। সেই অসন্তুষ্টি থেকেই মূলত নতুন এই সুপার লিগের ভাবনা। এই লিগে স্রেফ অংশ নিলেই বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় হবে, এমনই লক্ষ্য ক্লাবগুলির।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০ ক্লাব দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে খেলবে। প্রতি গ্রুপের শীর্ষ তিন দল উঠবে কোয়ার্টার ফাইনালে। গ্রুপের চতুর্থ ও পঞ্চম হওয়া ক্লাবের প্লে অফ থেকে আসবে শেষ আটের অন্য দুই দল।

সুপার লিগের কাঠামো গড়ে তুলতে ও মহামারীর ধাক্কা সামলাতে ৩৫০ কোটি ইউরোর তহবিল জোগান দেবে সবগুলি ক্লাব মিলে। ফুটবলারদের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা যাবে না।

বিবৃতিতে সুপার লিগ কতৃপক্ষ জানিয়েছে, ইউরোপিয়ান ফুটবলের বাকি অংশকে তারা সংহতিমূলক অর্থ (সলিডারিটি পেমেন্ট) দেবে। এখন উয়েফার কাছ থেকে যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি হবে ওই সংহতিমূলক অর্থের পরিমাণ।

আলাদা এই লিগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন সুপার লিগের চেয়ারম্যান ফ্লোরেন্তিনো পেরেস।

“ ফুটবলকে প্রতিটি পর্যায়ে সাহায্য করব আমরা এবং এটিকে বিশ্বে সঠিক জায়গায় নিয়ে যাব। ফুটবলই একমাত্র বৈশ্বিক খেলা, যেটির চারশ কোটির বেশি সমর্থক আছে এবং বড় ক্লাবগুলির দায়িত্ব এই সমর্থকদের চাওয়া পূরণ করা।”

এই সুপার লিগের ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের চলমান কাঠামো বদলানোর ঘোষণা আসা ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের দল সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে করা হবে ৩৬। গ্রুপ পর্বে ছয়টির বদলে প্রতি দলকে খেলতে হবে ১০টি করে ম্যাচ। শেষ ষোলোর লড়াইয়ের আগে থাকবে প্লে অফ। এসব পরিবর্তনের ঘোষণা হওয়ার কথা সোমবারই।

উয়েফার অবস্থান : ইংলিশ, স্প্যানিশ ও ইতালিয়ান লিগ ও ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে উয়েফা জানায়, সম্ভাব্য সব উপায়ে তারা সুপার লিগের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে।

“ সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলিকে অন্য সব ঘরোয়া, ইউরোপিয়ান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ করা হবে এবং তাদের ফুটবলারদের জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়া নাও হতে পারে।”

“ যে ক্লাবগুলি এই লিগে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, বিশেষ করে ফরাসি ও জার্মান ক্লাবগুলি, তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই আমরা। সব ফুটবলপ্রেমী, সমর্থক ও রাজনীতিবিদদের আমরা আহবান করছি এমন একটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে, যদি সত্যিই এটা বাস্তব রূপ নেয়। কিছু ক্লাবের এমন স্বার্থপরতা অনেক দিন থেকে চলছে। কিন্তু যথেষ্ট হয়েছে।”

চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ভবিষ্যৎ ও পারিপার্শ্বিক অন্যান্য অনেক কিছু নিয়ে উয়েফার অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে সোমবার তাদের বৈঠকের পর।

ফিফা যা বলছে : ফিফার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আন্তর্জাতিক ফুটবলের কাঠামোর বাইরে ও ফুটবলের মৌলিকত্বের প্রতি শ্রদ্ধা না রাখা বিচ্ছিন্ন এই লিগের প্রতি ফিফা কেবল অসমর্থনই জানাতে পারে।”

তবে উল্লেখযোগ্যভাবে চোখে পড়ার মতো, এই ধরনের লিগে অংশ নিলে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করা হবে বলে ফিফার যে আগের ঘোষণা ছিল, এবারের বিবৃতিতে সেসবের কোনো উল্লেখ নেই।

শেয়ার