আসছে লকডাউনের সিদ্ধান্ত

 ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে 
অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন
যশোরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধির পর থেকে মাস্ক পরতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে বারবার জনগণকে চলাচলের কথা বলছে প্রশাসন। মাস্ক না পরলে সংক্রমণ আইন অনুযায়ী জরিমানাও করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তার পরেও রাস্তাঘাটে অনেক মানুষ মাস্ক পরছেন না। গতকাল যশোর শহরের দড়াটানা থেকে ছবিটি তোলা। রতন সরকার

সমাজের কথা ডেস্ক॥ সারাদেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনের অনুমতি প্রার্থনার ফাইল অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। হয়তো শনিবার (৩ এপ্রিল) রাতেই বৈঠকের সামারিসহ ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পৌছনো হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এখন চলছে ফাইল তৈরির কাজ। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
শনিবার বিকালে লকডাউনের রূপরেখা তৈরিতে জরুরি বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানা গেছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সোমবার ভোর ৬টা থেকে পরবর্তী ৭ দিনের জন্য লকডাউনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্পকারখানা পরিচালনারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
শনিবার (৩ এপ্রিল) সকালে সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, করোনা ঠেকাতে সারা দেশে সোমবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপরই বিকালে জরুরি বৈঠক ডাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসসহ সকল মন্ত্রণালয়, ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও লকডাউন বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থা ও দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মারা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে লকডাউনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। চূড়ান্ত করা হয়েছে লকডাউন বাস্তবায়নের কৌশল। এছাড়া শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হলে সেখানে শ্রমিকরা কিভাবে কারখানায় আসবে এবং কিভাবে কাজ করবে তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা শেষ করে তার জন্য কৌশলও চূড়ান্ত হয়েছে।

অপরদিকে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানিয়েছে শিল্প কারখানা খোলা রেখে সারাদেশে একযোগে লকডাউন দেওয়ার বিষয়ে কাজ চলছে।

এর আগে শনিবার সকালে মহামারী সামাল দিতে আবারও ‘লকডাউনের’ ঘোষণা আসছে বলে জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
তিনি বলেন, “করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সোমবার থেকে সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।”

শনিবার ঢাকায় নিজের সরকারি বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন সেতুমন্ত্রী কাদের। তবে সেই লকডাউনের ব্যাপ্তি কী হবে, কী কী খোলা থাকবে আর কী কী বন্ধ, তা সরকারের ঘোষণায় বিস্তারিত জানা যাবে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এক ভিডিও বার্তায় লাকডাউন পরিকল্পনা নিয়ে কিছুটা আভাস দেন।
তিনি বলেন, “করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ায়, সংক্রমণ রোধ করার স্বার্থে সরকার দু-তিন দিনের মধ্যে সারা দেশে এক সপ্তাহের লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
“সেক্ষেত্রে লকডাউন চলাকালে শুধু জরুরি সেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে। আর শিল্প কলকারখানা খোলা থাকবে, যাতে শ্রমিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন শিফটে কাজ করতে পারে।”
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গতবছর ২৩ মার্চ প্রথমবার ‘সাধারণ ছুটির’ ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। শুরুতে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ‘ছুটি’ ঘোষণা হলেও পরে তার মেয়াদ বাড়ে কয়েক দফা।
সে সময় সব অফিস আদালত, কল-কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে সারা দেশে সব ধরনের যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। ছুটির মধ্যে সব কিছু বন্ধ থাকার সেই পরিস্থিতি ‘লকডাউন’ হিসেবে পরিচিত পায়।
কিন্তু তাতে নি¤œবিত্তের জীবন-জীবিকা আর দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়লে বিভিন্ন মহলের দাবিতে সরকার ৩১ মের পর থেকে ধাপে ধাপে বিধিনিষেধ শিথিল করতে থাকে। বছরের শেষে এসে স স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকা ছাড়া আর সব কড়াকড়িই উঠে যায়।
ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রেখেই অর্থনৈতিক কর্মকা- সচল রাখার ভাবনা থেকে মাঝে পুরো দেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ জোনে ভাগ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী লকডাউনের বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা হয়েছিল। পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি এলাকায় সেই ব্যবস্থা চালানোও হয়েছিল। কিন্তু পরে আর তা এগোয়নি।
এদিকে নতুন বছরের শুরুরে দেশে সংক্রমণ হার অনেকটা কমে আসে। সারা দেশে শুরু হয় করোনাভাইরাসের গণ টিকাদান।
কিন্তু মার্চের শুরু থেকে দেশে আবার নতুন রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৬ হাজার ৮৩০ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে, যা মহামারী শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ।
দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৪ জনে। আর তাদের মধ্যে মোট ৯ হাজার ১৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সংক্রমণে লাগাম দিতে ২৯ মার্চ সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়সহ সকল ক্ষেত্রে সব ধরনের জনসমাগম সীমিত করাসহ ১৮ দফা নির্দেশনা জারি হয়। এরপর সেগুলো বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ির ঘোষণা আসতে থাকে।
সেদিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, গতবারের মত ‘সাধারণ ছুটি’ দেওয়ার কোনো আলোচনা হয়নি। তবে তার এক সপ্তাহের মাথায় নতুন করে লকডাউনের সিদ্ধান্তের খবর দিলেন তিনি।

 

শেয়ার