অগ্নিঝরা মার্চ

সমাজের কথা ডেস্ক॥ অসহযোগ আন্দোলনের ২৪তম দিনে যথারীতি বিক্ষুব্ধ মিছিলে মিছিলে উত্তাল শহরের রাজপথগুলো। বঙ্গবন্ধু তাদের উদ্দেশে বলেন, আমার মাথা কেনার শক্তি কারো নেই। বাংলার মানুষের সঙ্গে, শহীদের রক্তের সঙ্গে আমি বেইমানি করতে পারব না। আমি কঠোরতর নির্দেশ দেয়ার জন্য বেঁচে থাকব কিনা জানি না। দাবি আদায়ের জন্য আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। সংবাদমাধ্যমকেও একই কথা বলেন। এরপর তিনি কোথায় থাকবেন তা না জানলেও সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ঢাকার বাইরে পাক বাহিনীর এরিয়া কমান্ডাররা গণহত্যার তা-বলীলা শুরু করে দেয়। মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠক বাতিল করা হয় এবং ধীরে ধীরে পাকিস্তানি নেতারা করাচির বিমান ধরা শুরু করেন, যা সম্পর্কে সিদ্দিক সালিক বলেন as wise birds flee to their nests before the coming storm। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সমাগত বিভিন্ন মিছিলকারীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় বিরামহীনভাবে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই। তিনি বলেন, আগামীকালের মধ্যে সমস্যার কোন সমাধান না হলে বাঙালীরা নিজেদের পথ নিজেরা বেছে নেবে। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। কোন ষড়যন্ত্রই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। সরকারের প্রতি তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বাংলার জনগণের ওপর কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হলে তা বরদাস্ত করা হবে না। ২৩ মার্চ রাত থেকে ২৪ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাক সেনাবাহিনী সৈয়দপুর সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতলাগাড়ী, গোলাহাট ও কুন্দুল গ্রাম ঘেরাও করে অবাঙালীদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে ১০০ জন নিহত হয় এবং ১০০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়। শহরে কারফিউ দিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্য এবং অবাঙালীরা সম্মিলিতভাবে বাঙালীদের বাড়িঘরে আগুন দেয় এবং হত্যাকা- চালায়। রংপুর হাসপাতালের সামনে ক্ষুব্ধ জনতা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে পাকসেনারা রংপুর সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় নিরস্ত্র অধিবাসীদের ওপর বেপরোয়াভাবে গুলিবর্ষণ করে। এতে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত এবং বহু আহত হয়। চট্টগ্রামে পাক সেনারা নৌবন্দরের ১৭নং জেটিতে নোঙর করা এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাস করতে গেলে প্রায় ৫০ হাজার বীর বাঙালী তাদের ঘিরে ফেলে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা জাহাজ থেকে কিছু অস্ত্র নিজেরাই খালাস করে ১২টি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতা গতিরোধ করে। সেনাবাহিনী ব্যারিকেড রচনাকারী জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে ২০০ জন শ্রমিক শহীদ হন। জরুরী বৈঠকের কথা বলে লে. জে. টিক্কা খান দুপুরবেলা হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম থেকে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকায় সরিয়ে নিয়ে আসেন। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদ চৌধুরী। তাদের সেনানিবাসে বন্দী করে রাখা হয়। এটা ছিল মূলত অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনার সঙ্গেই সম্পৃক্ত। ইতোমধ্যে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর গণহত্যার নীলনক্সা সমাপ্তির পথে। শেষ আঁচড়ের কাজ চলছে ইস্টার্ন সদর দফতরে। ঢাকার বাইরে হত্যালীলা শুরু করে দেয় পাকবাহিনীর এরিয়া কমান্ডাররা। সৈয়দপুরে পাকসেনা ও অবাঙালী বিহারিরা যৌথভাবে গণহত্যা শুরু করে। দিনের প্রথমভাগের মধ্যেই রংপুরে পাকসেনাদের কয়েকটি হেলিকপ্টার অবতরণ করে। সেখানে ব্রিগেড কমান্ডারের বাসভবনে গোপন শলাপরামর্শ করে মেজর জেনারেল জানজুয়া, মেজর জেনারেল মিঠঠা খান প্রমুখ। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং রাও ফরমান আলী দুটি হেলিকপ্টারে চড়ে সবক’টি সেনানিবাসে গিয়ে ব্রিগেড কমান্ডারদের নীলনক্সা সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করেন।

 

শেয়ার