পুরোনো পুকুরগুলোর একটা গল্প থাকে

মা মু ন আ জা দ

সদ্য যোগদানকারী জেলার সাহেব দোস্ত রুবেল। তার কাছ থেকে ‘জেলখানার ভাত’ শিরোনামে এলো দাওয়াত। চমকে গেলাম। এ সুযোগ তো বার বার আসে না। আসামি না হয়েও জেলের ভাত খাওয়ার সৌভাগ্য যখন হলো, তখন আর মিস করি কী করে! ভাগ্যটা আমার যাকে বলে পয়মন্ত। ছুটির দিনে পূর্ণিমা!
জেলার সাহেবের বাসায় ভুরিভোজ। অতঃপর জেলখানার পুকুর ঘাট। সেখানে বসে চাঁদ দেখতে দেখতে জেলারের ‘যখন ডুবিয়াছে পূর্ণিমার চাঁদ, মরিবার হল তার স্বাদ’ আবৃত্তি একটা ঘোর সৃষ্টি করছিল। চারপাশে তাল আর নারকেল গাছগুলো যেন চুল ছেড়ে দিয়ে গল্প করছে। পুকুরের চাঁদটাকে অনেক মনে হতে লাগলো।
এই জেলখানায় ছিলো ইংরেজ জেলার থমসন সাহেব। তার সুন্দরী কন্যা মার্গারেট এক দেশীয় বিল্পবী কয়েদীর প্রেমে পড়েছিলেন। জাত্যভিমানী ইংরেজ সাহেব সেটা মানবেন কেন? ওদিকে মেয়েও নাছোড়বান্দা। উপায়ান্ত না দেখে জেলার সাহেব কোলকাতা চলে যাবেন বলে মনস্ত করলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনের আগের পূর্ণিমারাতে মার্গারেট এই পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিল। সারারাত সারাদিন খুঁজেও তার লাশ পাওয়া গেলো না। সেই পুকুরের পাড়ে আমরা। আকাশে প্রেমময় চাঁদ। পূর্ণিমায় টলটল। আজো নাকি মাঝে মাঝে পূর্ণিমারাতে পুকুরের সিঁড়িতে একটি মেয়েকে বসে থাকতে দেখা যায়। অনেকেই দেখেছে! তাকে দেখার আমার খুব সখ।
আমার বলা শেষ হতেই, জেলার লাফিয়ে উঠলো, ‘দূর! কবি গল্পকারদের নিয়ে এই এক জ্বালা; সবখানেই গল্পের প্লট খোঁজে। আমি গত তিন মাসে প্রায় রোজ রাতেই এখানে বসে চাঁদ দেখি। পুকুরে ওরকম কিছু পাইনি আমি।’ তারপর হা হা করে হেসে ওঠেন জেলার সাহেব।
‘আছে, গল্প আছে।’ রিমঝিম সেতারের মতো কণ্ঠ শুনে আমরা দুজন চমকে উঠলাম। আমাদের সোজাসুজি নিচের সিঁড়িতে মেয়েটা দাঁড়িয়ে! পূর্ণিমার আলোয় তার ভেজা চুল থেকে যেন সোনা ঝরে পড়ছে। কপাল থেকে চুল সরিয়ে বলে উঠলোÑ
‘এই পুকুরের আসলেই একটা গল্প আছে; শোনো তাহলে !’

শেয়ার