উদীচী ট্রাজেডি দিবস আজ ॥ উচ্চ আদালতে আপিল শুনানিতে ঝুলে আছে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরের উদীচী ট্রাজেডি দিবস আজ শনিবার (৬মার্চ)। ২২ বছরেও শনাক্ত হয়নি ঘাতক। জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। উচ্চ আদালতে আপিল শুনানিতে ঝুলে আছে মামলার বিচার কাজ। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল ময়দানে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের অনুষ্ঠান বোমা হামলায় নিহত হন ১০জন। তারা হলেন-নূর ইসলাম, নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রানী ঘোষ, ইলিয়াস মুন্সী, শাহ আলম বাবুল, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম, বুলু, রতন রায়, রামকৃষ্ণ। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে। আহত হন আড়াই শতাধিক মানুষ।

এ প্রসঙ্গে যশোর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এম ইদ্রীস আলী বলেন, উদীচী হত্যা মামলাটি উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। কয়েক বছর ধরে অপেক্ষায় থাকলেও শুনানি হয়নি। আপিল শুনানি নিষ্পত্তি না হলে নিম্ন আদালতে বিচার কাজ শুরু সম্ভব নয়।

জানা যায়, ১৯৯৯ সালে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলার ঘটনায় পৃথক দু’টি মামলা হয়। প্রথমে কোতোয়ালি পুলিশ মামলার তদন্ত শুরু করলেও পরবর্তীতে তা সিআইডির ওপর ন্যস্ত হয়। তদন্ত শেষে ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামসহ ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। পরবর্তীতে চার্জ গঠনের সময় উচ্চ আদালতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তরিকুল ইসলামকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এ মামলা আদালতে গড়ানোর ৭ বছর পর ২০০৬ সালের ৩০ মে মামলার রায় প্রদান করেন আদালত। রায়ে সব আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। মামলার এমন রায়ে যশোরসহ সারাদেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বিস্মিত হন।

এদিকে, দেশের আলোচিত জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান আটক হওয়ার পর পুলিশের কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার কথা স্বীকার করে। এই জবানবন্দীর ওপর ভিত্তি করে উদীচী হত্যা মামলা পুনঃতদন্তের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। মুফতি হান্নানের উদীচী হত্যাযজ্ঞ সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর জবানবন্দীর পর উদীচী হত্যা মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়। পরবর্তীতে এই হত্যা মামলায় মুফতি হান্নানকে যশোরে এনে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। ২০১০ সালের ৮ জুন ওই আপিল আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া ও কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানির পর আসামিদের বক্তব্য জানতে চেয়ে বিচারিক বেঞ্চ নোটিশ জারির আদেশ দেন। হাইকোর্ট থেকে জারিকৃত এ সংক্রান্ত নথিপত্র ২০১০ সালের ২৬ জুলাই যশোরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এসে পৌঁছায়। এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে খালাস পাওয়া আসামিরা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। সিআইডির ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে ২০০৬ সালের ৩০ মে আদালত থেকে খালাস পেয়ে যায় এই মামলার সব আসামি। পরে সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। কিন্তু এরপর মামলাটির আপিল শুনানি আর হয়নি। আটকে আছে আইনের বেড়াজালে। বিচারের এই দীর্ঘ বিড়ম্বনায় ক্ষুব্ধ যশোরের মানুষ এখন দ্রুত এ মামলার কার্যক্রম চালু করার দাবি জানান।

আহতদের একজন দুই পা হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা গ্রামের হরেন বাউল (৭২)। তিনি বলেন, দুই পা হারিয়ে (দুই পায়ের হাটুর নিচে থেকে কাটা) পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে আছি। আমার দুই সন্তান মারা গেছে। দুই ছেলের স্ত্রী, সন্তানসহ দশ সদস্যের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। ভক্তদের সহযোগিতায় কোন রকমে বেঁচে আছি। দুটি কৃত্রিম পা নষ্ট হওয়ার উপক্রম। মেরামতের অর্থ নেই। জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে সহযোগিতা কামনা করছি। তিনি আরও বলেন, যাদের কারণে পা হারিয়েছি, সেই অপরাধীরা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত হোক, এটাই দাবি করছি।

উদীচী ট্র্যাজেডিতে এক পা হারানো সুকান্ত দাস বলেন, উদীচী হত্যাকান্ডের মামলাটি বরাবর রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সরকার চাইলে বিচার সম্ভব। সরকার যখন চাইবে তখন বিচার হবে।

উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, মামলাটি রাজনীতিকরণ হওয়ায় সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। বিচার প্রক্রিয়াও ঝুলে আছে। বিচার কাজ তরান্বিত করার জন্য উদীচী কেন্দ্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দিয়েছে। সব সময় আমরা বিচার দাবি করছি। কিন্তু সেই দাবি বাস্তবায়নি হয়নি।
এদিকে, উদীচী ট্রাজেডি দিবস উপলক্ষে আজ (শনিবার) বিকেলে টাউন হল ময়দানে প্রতিবাদী গান, আলোচনা সভা ও শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

শেয়ার