মাথাগোঁজার ঠিকানা পেয়ে যশোরে ৬৬৬ পরিবারে এখন শুধুই উচ্ছ্বাস

 যশোর সদরে ২৯০ জনকে ঘরের চাবি ও জমির কাগজ তুলে দিলেন ডিসি

জাহিদ হাসান
যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের ভায়না গ্রামের লক্ষী কান্ত (৭০)। এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়েই তার সংসার। ভায়না-তারাগঞ্জ গ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বুড়ি ভৈরব নদীতে মৎস্য আহরণ করেই তার সংসার চলে। নিজের বলতে নেই কোন জমি। মাথা গোজার মতো আছে নদীর পাড়ে পলিথিন মোড়ানো খুপড়ি ঘর। আর সেই ঘরেই স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। মুজিববর্ষ উপলক্ষে সদর উপজেলার ফতেপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি পাকা ঘর পেয়েছেন লক্ষী কান্ত। ঘর পেয়ে তার চোখে মুখে আনন্দের শেষ নেই। গতকাল শনিবার সকালে সদর উপজেলা পরিষদে আসেন ঘরের চাবি ও জমির কাগজপত্র বুঝে নিতে। অনুষ্ঠানে তার হাতে ঘরের চাবি ও জমির দলিলের কাগজপত্র তুলে দেন যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খানসহ জনপ্রতিনিধিরা। চাবি ও দলিল হাতে পেয়ে কেঁদে ফেলেন লক্ষী কান্ত। পরে জমিসহ নতুন ঘর পাওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি সমাজের কথাকে বলেন, শেখ হাসিনার উছিলায় আমি আমার পরিবার নিয়ে এবার ভালো ঘরে ঘুমাতে পারবো। সারাজীবন ভাঙা ঘরে ঘুমিয়েছি। নদীতে মাছ মেরেছি আর ভাঙাঘরে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে দিন পার করেছি। এখন শেখ হাসিনা আমারে থাকার জন্য একটা ইটের ঘর দিয়েছে। শীতেও আর কষ্ট হবে না। সারাটি জীবন বুড়ি ভৈরব নদীর পাড়ে অন্যের জমিতে খুপড়ি ঘর বানিয়ে জীবনটা পার করছি। বয়স হয়েছে। এখন আর কাজ করতে পারিনে। জীবনে হাজারো দুঃখের মধ্যে স্বপ্ন ছিলো নিজের একখন্ড জমি আর ঘর। তবে জীবনের শেষ সময়ে আমার স্বপ্ন এবার বাস্তব হলো। শেখ হাসিনার কল্যাণে নতুন ঘর পেয়েছি। আমার নিজের পক্ষে এমন ঘর তৈরি সম্ভব হতো না। ঘর পেয়ে খুব খুশি লাগছে। আল্লাহ যেন শেখ হাসিনারে অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখে। সংসারের জিনিসপত্র নিয়ে দু’এক দিনের মধ্যে শেখ হাসিনার দেওয়া ঘরে উঠবে বলে জানান তিনি। শুধু লক্ষীকান্ত নয়; তার মতো একই এলাকায় ঘর পেয়েছেন মায়ারানি, রহিমা, আসলাম গাজী। এতদিন ঠিকানাহীন থাকা তাদের সবার চোখে মুখে এখন শুধুই উচ্ছ্বাস।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে যশোর জেলায় এক হাজার ৭৩ জনকে গৃহ ও ভূমিহীনের মাঝে ঘর ও জমি প্রদান করা হবে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে আট উপজেলায় শনিবার ৬৬৬ টি ভূমিহীনের মাঝে ঘর ও জমি প্রদান করা হয়। শনিবার সকালে জাতীয়ভাবে ঘর ও জমি প্রদান অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে যশোর সদর উপজেলায় অংশে ২৯০ জনকে জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান ঘরের চাবি ও জমির কাগজপত্র প্রদান করেন। একই সময় জেলার ৮টি উপজেলায় একযোগে প্রকৃত গৃহহীনদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মতো মোট ৬৬৬ জনকে ঘর ও জমি প্রদান করা হয়। ঘরের চাবি ও জমি হস্তান্তরের আগে জাতীয় অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। যশোর সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রফিকুল হাসান, সদর উপজেলার চেয়ারম্যান নুরজাহান ইসলাম নীরা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুজ্জামান, যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামানসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে যশোরের আট উপজেলায় এক হাজার ৭৩টি পরিবারকে জমিসহ নতুন ঘর দেয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে যশোরের আট উপজেলায় প্রথম ধাপে ৬৬৬টি পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জমিসহ ঘর প্রদান করা হয়েছে। যা প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর সুবিধাভোগীদের জমির দলিলসহ ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ৪০৭ পরিবারকে দ্রুততম সময়ে জমি ও ঘর হস্তান্তর করা হবে। এদিন সদর উপজেলায় ২৯০টি, বাঘারপাড়ায় ১৪টি, ঝিকরগাছায় ১৯টি, চৌগাছায় ২৫টি, মণিরামপুরে ১৯৯টি, অভয়নগরে ৫৭টি, কেশবপুরে ১২টি এবং শার্শায় ৫০টি পরিবারকে দুই শতক জমি, দৃষ্টিনন্দন ইটের গাঁথুনি, রঙিন টিনের ছাউনি বিশিষ্ট দুই রুম বিশিষ্ট ঘর, রান্নাঘর, টয়লেট রয়েছে। প্রতিটি ঘরের জন্য ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়।

শেয়ার