টিকা পেতে আরও উৎসের খোঁজে সরকার

সমাজের কথা ডেস্ক॥ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাসের টিকার তিন কোটি ডোজ নিশ্চিত হলেও দেশের সব নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা পেতে অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গেও যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ডের এই টিকার তিন কোটি ডোজের মধ্যে প্রথম চালানে ৫০ লাখ ডোজ কয়েক দিনের মধ্যেই পাওয়ার আশা করছে সরকার। প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে ছয় মাসে এই টিকা আসবে।

এর বাইরে বিশ্বজুড়ে টিকা সরবরাহে গঠিত আন্তর্জাতিক জোট কোভ্যাক্স থেকে ফাইজারের টিকাও নিতে চায় সরকার। চিঠির জবাবে কোভ্যাক্সকে এরইমধ্যে সম্মতি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা কী পরিমাণ টিকা দেবে সে বিষয়ে এখনও কিছু জানা যায়নি। তবে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার নিচে সংরক্ষণের এই টিকা খুব বেশি পরিমাণে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাংলাদেশে নেই।

এর বাইরে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনস-গ্যাভি বাংলাদেশকে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

তবে দেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য প্রয়োজন ৩৪ কোটি ডোজ টিকা। সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে প্রয়োজনীয় টিকার সংস্থান করা যায়, সেজন্য অন্যান্য কোম্পানির টিকা আনতে তৎপরতা চলছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাশিয়ার স্পুৎনিক, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না এবং ফ্রান্সভিত্তিক বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি সানোফির টিকা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া ভারত বায়োটেক এবং চীনের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাংলাদেশে করতে চাইছে।
এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সুযোগ দেওয়া হবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “ভারত বায়োটেক এবং চীনের আনহুই ঝিফেই লংকম বায়োফার্মাসিউটিক্যালস নামে একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

“চীনের প্রতিষ্ঠানটি বড় একটি কোম্পানি, তারা চীন সরকারের সঙ্গেও কাজ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি অবহিত আছেন। আমরা তাদেরকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার জন্য বলে দিয়েছি। তারা তাদের প্রসেসগুলো পার করলে ট্রায়ালে যেতে পারবে।”

যারা টিকা দিতে চায় বা টিকা বানাতে সক্ষম এমন সবগুলো দেশের সঙ্গে সরকার নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বলে জানান তিনি।
“আমরা শুধু একটা কোম্পানির সঙ্গে টাইআপ করতে চাই না। মডার্না, সানোফির সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা এখন পর্যন্ত কোনো কিছু জানায়নি। রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের একাধিকবার কথা হয়েছে। তারা যদি প্রপার ডকুমেন্ট নিয়ে আবেদন করে তখন আমরা বিবেচনা করব। যদি প্রটোকল অনুযায়ী হয় তাহলে আমরা সেই ভ্যাকসিনও নেব। অবশ্য রাশিয়া এখন পর্যন্ত আবেদন করে নাই।”

টিকার জন্য বিকল্প উৎস খুঁজতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশের সবাইকে দিতে যে পরিমাণ টিকা লাগবে তা একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।

“১৭ কোটি মানুষের জন্য ৩৪ কোটি ডোজ টিকা লাগবে। আমরা যদি দ্রুত টিকা দিতে চাই তাহলে একটি কোম্পানি তা দিতে পারবে না। সারা দুনিয়ায়ই টিকার চাহিদা রয়েছে। এ কারণে একাধিক সোর্স থেকে টিকা নেওয়া দরকার। যারা অনুমোদন পায়নি তারা ট্রায়াল করতে চাইলে সেই সুযোগ দিতে হবে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, চীনের আনহুই ঝিফেই লংকম বায়োফার্মাসিউটিক্যালস বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের মাধ্যমে গত ১০ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য আবেদন করেছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেই আবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কয়েকটি বিষয় জানতে চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঝিফেইকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

“তারা এটা কবে থেকে শুরু করতে পারবে, আর কোনো দেশে ট্রায়াল করেছে কি না, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার পর তারা আমাদের কতগুলো টিকা দেবে, যদি সত্যি সত্যি কাজ করে তাহলে এর প্রযুক্তি আমাদের দেশে ট্রান্সফার করবে কি না, ট্রায়াল করতে কতদিন লাগবে, কতগুলো লোকের ওপর ট্রায়াল করবে- এসব বিশদ জানতে চেয়েছি।”

তিনি জানান, চীনা প্রতিষ্ঠানটি এরইমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন-সিআরও নিয়োগ করেছে। ইতোমধ্যে বিএসএমএমইউর সঙ্গে তাদের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, “আমরা চাই তারা ট্রায়াল করুক। এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে।”

গত জুনে ঝিফেইয়ের টিকার প্রথম ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়। জুলাইয়ে হয়েছে দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা। গত নভেম্বরে তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করে ঝিফেই। বিভিন্ন দেশের ২৯ হাজার মানুষের ওপর এই ট্রায়াল চালানোর কথা।

নভেল করোনাভাইরাস বা সার্স-কোভ-২ ভাইরাস স্পাইক প্রোটিন (এস), মেমব্রেন প্রোটিন (এম), এনভেলপ প্রোটিন (ই), নিউক্লিওপ্রোটিন (এন) ও রাইবোনিউক্লিক এসিড (আরএনএ) নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে এস-প্রোট্নিটি শরীরে প্রবেশ করে মানুষকে আক্রান্ত করে। এই প্রোটিনের অংশ নিয়ে ঝিফেইয়ের টিকার ডিজাইন করা হয়েছে।

ডা. খুরশীদ আলম বলেন, ভারত বায়োটেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য কোনো আবেদন করেনি। এ বিষয়ে তিনিও বিস্তারিত জানেন না।

তহবিল জটিলতায় পিছিয়ে যাওয়া সিনোভ্যাক বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে চাইলে পারবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তবে কো-ফাইনান্সের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর সিনোভ্যাক আর যোগাযোগ করেনি বলে জানিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা বলি নাই চলে যাও, তারাই চলে গেছে। তবে তারা আর যোগাযোগ করেনি। আমার সঙ্গে আর কোনো অ্যাপ্রোচ করেনি।”

তিনি বলেন, সিনোভ্যাক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আবেদন করার পর তা অনুমোদনের জন্য সরকারি কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়েছিল। এ কারণে অনুমতি দিতে কিছুটা দেরি হয়েছিল।

“এ ধরনের বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানাতে হয়। সেখান থেকে আমরা অনুমতি পেয়ে চায়নাকে জানালাম যে, ট্রায়াল করতে পারেন। তখন তারা আর আসল না, কথার বরখেলাপ করল। তারা আগে বলেছে ফ্রি ট্রায়াল করবে, পরে উল্টো আমাদের কাছে টাকা চেয়েছে। টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন দেওয়ার পর আবার টাকাও দেওয়া লাগে। পৃথিবীর আর কোথাও এ ধরনের ঘটনা আছে কি না আমার জানা নেই।”

ঝিফেইয়ের ক্ষেত্রেও যেন এমনটা না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ড. মুশতাক হোসেন।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই গবেষক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিনোভ্যাক বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে চেয়েছিল। কিন্তু অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বেশি সময় লাগায় অন্যান্য দেশে তাদের প্রত্যাশিত সংখ্যক মানুষের ওপর পরীক্ষা হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে বাংলাদেশের কাছে টাকা চেয়েছে সিনোভ্যাক।
“ঝিফেইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল হয়ে গেছে। তৃতীয় পর্যায়ে ২৯ হাজার মানুষের ওপর প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে। ইতোমধ্যে তারা একটি দেশে ট্রায়াল শুরু করেছে। বাংলাদেশে ট্রায়াল করলে তাদের ২৯ হাজার জনের ওপর ট্রায়াল পুরো হবে। কিন্তু বাংলাদেশ অনুমোদন দেওয়ার আগেই যদি ২৯ হাজার জনের ওপর ট্রায়াল হয়ে যায় তাহলে তারা আর করবে না। আমরা আরেকটা চান্স হারাব।”

গত বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি চীন সিনোভ্যাকের তৈরি টিকা ‘করোনাভ্যাক’ পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমতি দেয়। ইতোমধ্যে ব্রাজিল, চিলি, তুরস্ক, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়ায় এই টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়েছে।

সিনোভ্যাকের তৈরি টিকার তুরস্কে ৯১ দশমিক ২৫ শতাংশ, ব্রাজিলে ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৬৩.৩ শতাংশ কার্যকারিতা পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত ছয়টি টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে, তার মধ্যে করোনাভ্যাক একটি।

শেয়ার